বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এই সমস্যা হইতে কী করিয়া উত্তরণ ঘটিবে?

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩০

লন্ডনের জেডপ্রেস প্রকাশনা হইতে ১৯৭৯ সালে সুপরিচিত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুল্টজ বাংলাদেশের উপর একটি বিশেষ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। ‘বাংলাদেশ : দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন’ শিরোনামের এই গ্রন্থে বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত এক্সরে চিত্র দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন, যেইখানে প্রসঙ্গক্রমে উঠিয়া আসিয়াছে, ২৯ জন বিশেষ ব্যক্তিবর্গের নাম—যাহার মধ্যে রহিয়াছেন শেখ মুজিবুর রহমান, আইয়ুব খান, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রহিম, সিরাজ শিকদার, জিয়াউর রহমান, জুলফিকার আলি ভুট্টো, ইয়াহিয়া খান, ফিলিপ চেরি প্রমুখ। বইটির শিরোনাম বলিয়া দেয় যে, লরেন্স লিফশুল্টজ মনে করিতেন, বাংলাদেশে বিপ্লব অসমাপ্ত রহিয়াছে। 

এই প্রসঙ্গে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক বেনেডিক্ট রিচার্ড ও ’গর্ডন অ্যান্ডারসনের গ্রন্থ ‘ইমাজিনড কমিউনিটিস’-এর কিছু পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করিতে পারি। এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলিয়াছেন, নূতন রাষ্ট্র গঠনের পর সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ‘ইতিহাসের এক নূতন যুগ’, ‘সূর্যোদয়’ প্রভৃতি উপমা ব্যবহার করিয়া থাকে। এই সকল শব্দের সঙ্গে ‘পুনরুজ্জীবন’, ‘পুনর্জন্ম’ ইত্যাদি প্রতীকী শব্দেরও ব্যবহার করা হইয়া থাকে। ইহা মূলত এমন এক সময়, যখন মানুষের আশা বহুদিকে ছুটিতে থাকে। ইহার ভিতর দিয়াই দিনবাহিত এই সকল রাষ্ট্রে, ধীরে ধীরে উন্নয়নও চলে। সেই সঙ্গে চলে দুর্নীতির ফল্গুধারা। কলসির তলায় ছোট্ট ছিদ্র থাকিলে খুব বেশি সমস্যা হয় না। কিন্তু সেই ছিদ্র যদি বড় হয় এবং ছিদ্রের সংখ্যা ও আয়তন যদি দিনদিন বৃদ্ধি পায়, তাহা হইলে সেই কলসির ভিতরে প্রয়োজনের চাইতেও ঘন ঘন পানি ভরিতে হয়। মানুষের শরীরেও যদি কোথাও নীরবে রক্তক্ষরণ দিনদিন বৃদ্ধি পায়, তাহা হইলে যতই আয়রনসমৃদ্ধ ভালো ভালো খাবার খাওয়া হউক না কেন, শরীরের ফ্যাকাশে বর্ণের পরিবর্তন হইবে না। ঠিক একইভাবে একটি অনুন্নত রাষ্ট্র যখন ক্রমশ উন্নয়নের সোপানে পা রাখিতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রটি হয় ঐ কলসি বা মানবশরীরের মতো—যাহার ভিতরকার দুর্নীতি নামক বড় বড় ছিদ্র বা অধিক রক্তক্ষরণকে আটকাইতে হয়।

কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে। দূর হইতে যখন আকাশে ধোঁয়া দেখা যায়, তখন সহজেই অনুমান করা যায়, সেইখানে আগুন লাগিয়াছে। একটি ভূখণ্ডে যদি ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়, তখন ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সেই ভূমির গঠনপ্রক্রিয়া এখনো সুসম্পন্ন হয় নাই। যেমনটি দেখা যায় জাপানে। সেই দেশটির অসংখ্য দ্বীপের নিচের টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ভূগঠন এখনো চলমান। সেই কারণেই সেইখানে স্থিতি আসে নাই, কাঁপিয়া উঠিতেছে সময়ে-অসময়ে। বিশ্বের বহু স্থানেই ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে নানান রাষ্ট্রের গঠনের ক্ষেত্রেও এই ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ভিতরে ভিতরে ঐ সকল রাষ্ট্র ফুঁসিতে থাকে। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির বৈশিষ্ট্য হইল, উহা বেশির ভাগ শান্ত—চুপচাপ থাকে, কিন্তু যে কোনো সময়, যখন-তখন উহার ভিতর দিয়া তপ্ত লাভার উদিগরণ ঘটিতে পারে। যখন আগ্নেয়গিরি শান্ত চুপচাপ থাকে, তখন বোঝা যায় না যে, উহার ভিতরে এত জ্বলন্ত লাভাসে াত জমিয়া আছে। কিন্তু যাহারা জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ব্যক্তি তাহারা জানেন এবং বোঝেন, এই ধরনের আগ্নেয়গিরি হইতে হঠাত্ উদিগরণ হওয়াটাই প্রকৃত বাস্তবতা। ইহাতে বিস্মিত হইবার কিছু নাই। অসমাপ্ত বিপ্লবের আলামত ছাইচাপা আগুনের মতো ভিতরে ভিতরে ধিকিধিকি করিয়া জ্বলিতেই থাকে। সুতরাং যেই বিপ্লব অসমাপ্ত, যাহার মাটির নিচে টেকটোনিক প্লেটে সমস্যা রহিয়াছে, সেই ভূখণ্ড তো বারংবার কাঁপিয়া উঠিবেই।

এই জন্য অসমাপ্ত বিপ্লব যেইখানে বিদ্যমান, সেইখানে সহিংসতা, হানাহানি, বড় বড় হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান-পালটা-অভ্যুত্থানসহ সকল কিছু মিলাইয়া একটি কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতা তৈরি হইয়া থাকে। ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনো বিশ্বের নানান রাষ্ট্রে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। সুতরাং কেন বারংবার লাভার উদিগরণ হয়, সমস্যাটা কোথায়—ইহা বড় প্রশ্ন নহে। বরং প্রশ্ন হইল—এই সমস্যা হইতে কী করিয়া উত্তরণ ঘটিবে?

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন