রমজানের শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম রজনি লাইলাতুল কদর

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:২৯

আরবি সাওম শব্দ একবচন, বহুবচনে সিয়াম। ফারসি শব্দ রোজা। রোজা একটি ফরজ ইবাদত। কুরআন-হাদিসের মতে, পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজার ফজিলত বেশি। রোজা দৃশ্য-অদৃশ্যমান ইবাদত। রমজানকে ইবাদত বন্দেগির উত্সবের মাস বলা হয়। রমজান মাসে রোজা পাপকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। রমজান মাসের ইবাদতে মুমিন জান্নাত লাভ করেন। রমজান মাসে বেশি পবিত্র কুরআন ও হাদিস পাঠ করা হয়। রোজার ইবাদতের প্রতিদান মহান আল্লাহ নিজেই প্রদানের ঘোষণা করেছেন।

মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরতের দুই বছর পর ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামে রোজা বাধ্যতামূলক ফরজ করা হয়। আগেকার নবি, রসুল ও উম্মতগণের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। নবি আদম (আ.)-এর সময় মাসে তিন দিন, দাউদ (আ.)-এর সময় এক দিন পরপর রোজা রাখতেন। নবি মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে ৩০ দিন, পরবর্তীকালে আরো ১০ দিনসহ ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। রমজান মাসকে রহমত, বরকত ও নাজাত—এ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রমজানে জান্নাতের দরজা খুলে দিয়ে জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়। রোজাদারগণ রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবেন। রোজার মাধ্যমে বান্দা নিজেকে মুত্তাকি হিসেবে তৈরি করেন।

ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনা মাহে রমজানকে মহিমান্বিত করেছে। রমজান মাসে আসমানি কিতাব তাওরাত হজরত মুসা (আ.), জাবুর হজরত দাউদ (আ.), ইঞ্জিল হজরত ইসা (আ.), কুরআন মাজিদ হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর নাজিল হয়।

কোনো কোনো বর্ণনামতে, ঐতিহাসিক মেরাজের ঘটনা ঘটে পবিত্র রমজান মাসে। বদর, তাবুক, কাদেসিয়া যুদ্ধ হয়েছিল। অষ্টম হিজরির ২০-২১ রমজান শুক্রবার রসুল (স.) ৩৬০টি মূর্তি অপসারণ করে আল্লাহর ঘর কাবা শরিফকে পবিত্র করেন। ২৫ রমজান নাকল জায়গায় উজ্জা মূর্তি হজরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.) অপসারণ করেন। নবম হিজরির রমজান মাসে তায়েফের সাকিফ গোত্রের লোকেরা লাত নামক মূর্তি অপসারণ করে। উম্মুল মোমিনীন হজরত খাদিজা (রা.), নবিজির মেয়ে রুকাইয়া, হজরত ফাতেমা (রা.), হজরত আলি (রা.), হজরত আবু বক্কর (রা.) ইন্তেকাল করেন। নবিজির নাতি হজরত হাসান (রা.), হজরত আব্দুল কাদির জিলানি (র.)-র জন্মসহ অসংখ্য ঘটনা রমজানেই ঘটে।

ইসলাম ধর্মে রোজার ধর্মীয় মানবিক ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সর্বাধিক। রোজা মানবহূদয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি ও ভীতি বৃদ্ধি করে। ইসলামের মূল উত্স কুরআন। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমরা যারা ইমান এনেছ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরজ করা হয়েছিল।’

শবেকদর শব্দ ফারসি এবং লাইলাতুল কদর শব্দ আরবি। এর অর্থ মহিমান্বিত পবিত্র রজনি। কদর শব্দের অর্থ সম্মান-মর্যাদা। কদরের রাতে হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর উম্মতদের সম্মান বৃদ্ধি ও ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়।  ৬১০ সালে কদরের রাতে মক্কার নূর পর্বতের হেরা গুহায় কুরআনের ৯৭তম সুরা কদর নাজিল হয়। ইসলাম ধর্মমতে, হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর পূর্ববর্তী নবি ও তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করায় বহু বছর ইবাদত করার সুযোগ পেয়েছিলেন।  হজরত মুহাম্মদ (স.) রমজানের  শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। বেশির ভাগের মতে ২৭ রমজান লাইলাতুল কদর হতে পারে।

রোজা সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার শিক্ষা দেয়। পবিত্র রমজান মাসে মুসলিম-অমুসলিম সম্প্রদায়ে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অমুসলিমরা রোজার কোনো ক্ষতি হয়, এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকেন। মুসলিম বিশ্বে রমজান মাসে আলাদা এক আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে। রমজান মাসে ধনীদের দান-খয়রাত বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা ফিতরার টাকা প্রতিবেশী গরিব অমুসলিমদের মধ্যেও বিতরণ করেন।

রমজান মাসের পরের মাস শাওয়াল, আরবি শব্দ শাওয়ালের অর্থ উঁচু, উন্নত করা, পাল্লা ভারি করা, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া এবং প্রার্থনায় হাত উত্তোলন করা। রমজানের রোজা পালনের পর পুনরায় রোজা রাখলে রমজানে রোজা কবুলের একটি প্রমাণ। রমজানের এক মাস রোজায় সীমাবদ্ধ না থেকে বছর জুড়ে, জীবন জুড়ে রোজার অনুশীলন থাকে। সেজন্য রসুল (স.) ১২ মাসে বিভিন্ন সময় নফল রোজা রেখে উম্মতকে উত্সাহিত করেছেন। তিনি রমজানের ফরজ রোজা রাখার পর যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসের আরো ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল, সহি মুসলিম।  রসুল (স.) বলেছেন শাওয়াল মাসের ছয় দিনে আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ। সুতরাং এ মাসে ছয়টি রোজা রাখলে আল্লাহ প্রত্যেক সৃষ্টি জীবের সংখ্যার সমান নেকি দেবেন এবং সমান গুনা মুছে দেবেন। হাদিসের মতে শাওয়াল মাসে বিয়ে-শাদি সুন্নত। মা আয়েশার বিয়ে শাওয়াল মাসে শুক্রবার মসজিদে নববিতে হয়েছিল। রমজান মাসে রোজার বিচ্যুতি দূর করে শাওয়ালের ছয় রোজা।

রমজানের এক মাস রোজায় রোজাদারের এক-দেড় কেজি ওজন কমে যায়, সুগার ভালো থাকে। সারা বছর ভেজাল খাদ্য খাওয়ায় যে জৈববিষ পেটে জমা হয়, তা এক মাস রোজায় সহজেই দূরীভূত হয়। রোজায় কিডনিতে সঞ্চিত পাথরক্ষণা ও চুন দূরীভূত হয়। পেপটিক আলসারের রোগীরা রোজা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মস্তিষ্কের  সেরিবেলাম ও নিমরিক সিস্টমের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখায় মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করে।

নোবেল পুরস্কারবিজয়ী ওষুধ ও শল্যচিকিত্সার ডাক্তার অ্যালেকসিক্স বলেছেন, রোজার উপবাসের মাধ্যমে লিভার, রক্ত সঞ্চালন দূর হয়। ফলে ত্বকের নিজের সঞ্চিত চর্বি পেশি, প্রোটিন গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। বিশ্ববিখ্যাত চিকিত্সাবিজ্ঞানী নাস্টবারনারের মতে ফুসফুসে সর্দি, কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জার কয়েক দিন রোজার কারণে নিরাময় হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডাক্তার আব্রাহাম জেহেনরি বলেছেন, রোজা হলো পরম হিতৈষী ওষুধ। রোজায় বাত, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হূদেরাগ ও উচ্চ রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে রোজাদারগণ কম আক্রান্ত হন। ডাক্তার আইজাক জেনিংস বলেছেন, যারা আলস্য ও গোঁড়ামির কারণে অতি-ভোজন করে নিজের সংরক্ষিত জীবনীশক্তিকে ভারাক্রান্ত করে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়, তাদেরকে রোজা রক্ষা করে। ডাক্তার সেলটন তার ‘সুপিরিওর নিউটিন’ গ্রন্থে বলেছেন— উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোটিন, চর্বি, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পচিত হয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টির বিধান হয়। রোজা বিশ্বে ধর্মীয়, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি দেয়।

ইত্তেফাক/এএইচপি