বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংঙ্কিং বাড়াতে মানসম্মত জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশনার গুরুত্ব

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ১৬:৫৬

একটি দেশের উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় এবং একইসঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। কোন দেশ কতটা উন্নত, তার মানদণ্ড হিসেবে ঐ দেশের শিক্ষা ও গবেষণাকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একটি গবেষণা ভালো কোন জার্নালে প্রকাশনার মধ্য দিয়েই মূলত ঐ গবেষণা কাজটির গুরুত্ব প্রকাশ পেয়ে থাকে। 

ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর মূলত একটি জার্নালের প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রকাশের অনেকগুলো নির্দেশকের মধ্যে অন্যতম। একটি জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর নির্ণয় হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা  এবং এখান থেকে প্রাপ্ত সাইটেশন সংখ্যার  মাধ্যমে। সাইটেশন হচ্ছে কোন গবেষকের গবেষণাকর্ম অন্য একজন গবেষক যখন তাঁর গবেষণায় ব্যবহার করেন এবং উদ্ধৃত করেন তাকে আমরা  সাইটেশন বলে থাকি। তবে আমাদের স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন যে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর শুধুমাত্র Clarivate Analytics-ই প্রদান করে এবং এই জার্নালগুলো সাধারণত Web of Science (WoS) ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া Scopus ইনডেক্স জার্নালগুলো CiteScore প্রদান করে থাকে।

হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর যুক্ত জার্নালে গবেষণা প্রকাশনা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং এবং বৈশ্বিক সুনাম বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জার্নালগুলি, তাদের শক্তিশালী পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়া এবং অসংখ্য পাঠকদের জন্য বিখ্যাত, একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং উদ্ভাবনের মানদণ্ড হিসাবে কাজ করে থাকে। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি সদস্য এবং গবেষকরা তাদের কাজ এই ধরনের অত্যধিক মর্যাদাপূর্ণ জার্নালে প্রকাশ করেন, তখন এটি কেবল প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা ও দৃশ্যমানতাই বাড়ায় না বরং এর একাডেমিক প্রতিপত্তি এবং প্রভাবেও অবদান রাখে। হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালগুলি গবেষণা, প্রভাবশালী আবিষ্কার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞানের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের সাথে যুক্ত থাকে। ফলস্বরূপ, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি সদস্যরা নিয়মিত এই জার্নালে প্রকাশ করে তাদের নিজ নিজ শাখার মধ্যে গবেষণা ও বৃত্তির ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হিসেবে বিবেচিত করা হয়।

অন্যদিকে, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে গবেষণা প্রকাশনা বিশ্বব্যাপী অন্যান্য বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান এবং গবেষকদের সাথে একাডেমিক সহযোগিতা এবং গবেষণার অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করে থাকে। এই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক খ্যাতি বাড়ায় একইসাথে গবেষণা তহবিলের সুযোগ, গবেষণা অনুদান, এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পুরষ্কারগুলোতে মনোনীত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে থাকে। এটি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক, মেধাবী ছাত্র এবং শিক্ষকের সমন্বয়ে গবেষণা  এবং গবেষণা তহবিলকে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে গবেষণা প্রকাশনা উচ্চ শিক্ষার প্রতিযোগিতামূলক ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিকস হিসেবে কাজ করে। রিসার্চ আউটপুট, বিশেষ করে হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশনা, কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস, টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস, ওয়েব মেট্রিকস এবং একাডেমিক র‌্যাঙ্কিং অফ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিস এর মতো সংস্থাগুলির দ্বারা বিবেচিত হওয়ার একটি মূল বিষয় ।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, খবরের কাগজে যখন আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর World Ranking দেখি তখন দেশের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন স্বাভাবিকভাবেই। কারণ দেশ প্রেমিক সকল নাগরিকই প্রত্যাশা করেন বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাংলাদেশেরও নাম থাকুক। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা সচেতন নাগরিকদের অজানা নয়। আমরা সকলেই জানি, বিশেষ করে যে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেট বেশি, গবেষণায় বরাদ্দ বেশি, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এগিয়ে, দেশি-বিদেশি শিক্ষক - শিক্ষার্থী রয়েছে, উল্লেখযোগ্য সাইটেশন রয়েছে এবং আরো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ন নির্ধারক রয়েছে যা World Ranking এ ভূমিকা পালন করে তার বেশিরভাগই আমাদের দেশে অনুপস্থিত বা থাকলেও যৎসামান্য।  মালয়েশিয়ার সাবেক  প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সম্পর্কে একটা ধারনা প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি তাঁর দেশের উচ্চ শিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার জন্য মালয়েশিয়ান নাগরিক যারা বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং গবেষণাগারে নিয়োজিত ছিলেন তাঁদেরকে গভীর রাতে পর্যন্ত টেলিফোন করে দেশে এসে তাঁদের নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হবার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। এবং এইভাবে তিনি সফলও হয়েছেন। বর্তমানে এশিয়ার চিন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড এইভাবেই উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে গিয়েছে। আমরা যখন এই ধরনের গল্প পড়ি তখন ভালো লাগে। আনন্দ পাই। আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেশের উচ্চশিক্ষার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে যখন এই ধরনের উদ্যোগ নেয় তখন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং এর সাথে সম্পৃক্ত সকলের উচিৎ বাহিরের গুণী শিক্ষাবিদদের সাধুবাদ জানানো এবং উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার পরিধি বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত গবেষণা কাজের পরিধি বৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত উদ্যোগসমূহ সহায়ক হতে পারে। ১. বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ফান্ডিং বৃদ্ধিঃ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গবেষণা ফান্ডিং প্রোগ্রাম প্রদান করা যেতে পারে যাতে শিক্ষার্থীরা ও শিক্ষকগণ তাদের গবেষণা প্রকল্পের জন্য অর্থ পেতে পারেন। ২. বৃহৎ পরিসরে গবেষণা উদ্যোগের প্রচারণা ও সহযোগিতাঃ বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে গবেষণা উদ্যোগের প্রচারণা করা এবং গবেষণা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা বা মূল্যায়ন করা। ৩. নিয়মিত গবেষণা উদ্যোগের কার্যক্রম: বিভিন্ন গবেষণা উদ্যোগের কার্যক্রম পরিচালনা করা, যেমন সেমিনার, সাম্মিলন, ওয়ার্কশপ, ইভেন্ট ইত্যাদি। ৪. আবশ্যিক ভাবে গবেষণা সুবিধা প্রদানঃ গবেষণা উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত সুবিধা প্রদান, যেমন গবেষণা ল্যাব, সরঞ্জামসমূহ, বিভিন্ন ধরণের অ্যাক্সেস প্রদান ইত্যাদি। ৫. বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা প্রতিযোগিতা আয়োজনঃ গবেষণা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত করা যেতে পারে যাতে গবেষণা উদ্যোগীদের প্রেরণা করা যায়। এই উদ্যোগসমূহ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত গবেষণা কাজের পরিধি বৃদ্ধি করতে  সহায়ক হবে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণে রূপরেখা দিয়েছেন। যেখানে মূল চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার আমূল পরিবর্তন। এই জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কিভাবে দেশ বিদেশ থেকে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, বৈজ্ঞানিক, গবেষকেদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের থেকে Knowledge Transfer এর মাধ্যমে দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া যায়।

সর্বোপরি আমরা বলতে পারি, QS ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস, টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং, এবং অ্যাকাডেমিক র‌্যাঙ্কিং অফ ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ (ARWU) এর মতো সম্মানজনক আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে গবেষণাপত্র  প্রকাশনার কোন বিকল্প নেই। এই ধরনের জার্নালে প্রকাশনার একটি শক্তিশালী ট্র্যাক রেকর্ড সহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ ডাটাবেজ থাকে, যা প্রতিভাবান শিক্ষক, ছাত্র এবং গবেষণা সহযোগীকে গবেষণা কাজে উদ্বুদ্ধ করে, একইভাবে একাডেমিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতিকে টেকসই  করে। তাই আমরা বলতে পারি, গবেষণার পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ করা, অনুষদ ভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পগুলোকে সহায়তা করা এবং একাডেমিক উৎকর্ষ সাধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা ও হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে গবেষণা প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং এবং বিশ্বব্যাপী খ্যাতি বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি অপরিহার্য কৌশল হতে পারে।

লেখক: 

হাসানুর রহমান (হাসান)

প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি 

 

ড. স্বপন চন্দ্র মজুমদার

প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/জেডএইচডি