বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

তাহাদের লাগাম টানিয়া ধরিবার সময় আসিয়াছে

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৩০

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সমস্যা বলিতে গেলে একই। এই সকল দেশে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙাইয়া চলে অরাজকতা ও ত্রাসের রাজত্ব। আমরা কথায় বলি, বাঁশের চাইতে কঞ্চি দড়। অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-পাতি নেতারা নিজ নিজ এলাকায় গড়িয়া তোলে বিশেষ লাঠিয়াল বা সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যোগসাজশে তাহারা সেই জনপদে চালায় স্টিমরোলার। তাহাদের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন হইয়া পড়ে দুর্বিষহ। তাহারা এলাকায় এমন ভীতিকর ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে যে, তাহাদের ভয়ে অনেকে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করিতে পারেন না। তাহাদের অন্যায়-অবিচারের কারণে অনেকে গৃহ ও এলাকা ছাড়া হইয়া পড়েন। তাহারা নিজেরা যেমন নানা ফৌজদারি অপরাধের সহিত জড়িত থাকে, তেমনি প্রতিপক্ষকে হয়রানি করিবার জন্য অবলম্বন করে নানা কূটকৌশল। এই জন্য তাহাদের বড় অস্ত্র হইল হামলা ও মামলা।

উন্নয়নশীল দেশে যেই সকল রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তাহাদের জনসমর্থন যে একেবারেই থাকে না, তাহা নহে। অনেক সময় দেখা যায়, তাহারা বড় রাজনৈতিক দল হইলেও দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী ও কিছু কুলাঙ্গারের কারণে শেষপর্যন্ত দেশে সেই দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় মারাত্মকভাবে। তাহারা মাদক কারবার হইতে শুরু করিয়া এমন কোনো অপরাধ নাই, যাহা তাহারা করে না। তাহাদের কেহ কেহ ধর্ষণসহ এমন সকল ফৌজধারি অপরাধের সহিত জড়িত, যাহার কারণে সমাজে সেই দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মুখ দেখাইবার জায়গা থাকে না; কিন্তু অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য, এত কিছুর পরও অনেক সময় তাহাদের ব্যাপারে প্রশাসন থাকে নীরব ও নিশ্চুপ। এমনকি দলের পক্ষ হইতেও বহিষ্কারসহ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সেই দলের উপকমিটির বিভিন্ন সদস্যও যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। এমনকি সেই প্রভাবশালী সদস্যের পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনও প্রভাবশালী হইয়া ওঠে। তাহারা সেই ব্যক্তি ও দলের নাম ভাঙাইয়া নানা অপরাধ সংঘটিত করে, তাহা কোনো সভ্য দেশে চলিতে পারে না। ন্যূনতম আইনের শাসন থাকিলে এমনটি হওয়ার কথা নহে। দলকে তাহারা এইভাবে নগ্ন করিলেও তাহাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় শেষপর্যন্ত দলই বিপদে পড়ে। ডাকিয়া আনে করুণ পরিণতি। তাহার পরও তাহারা ইহা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করে না।

স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ও পৃষ্ঠপোষকতায় যে ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরি হয়, তাহারা শেষপর্যন্ত সেই দল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রাস করিতে উদ্যত হয়। আজি হইতে ২০০ বত্সর পূর্বে উপন্যাসিক মেরি শেলি লিখেন ‘ফ্রাংকেনস্টাইন :অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ নামে একটি ভৌতিক উপন্যাস ও কল্পকাহিনি। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র উন্মাদ বিজ্ঞানী ড. ভিক্টর ফ্রাংকেনস্টাইন একটি শবদেহ হইতে সৃষ্টি করেন একটি মনস্টার বা দানব। শেষপর্যন্ত এই দানবের হস্তে তাহার স্রষ্টার নির্মম মৃত্যু হয়। এই চরিত্রটি উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির জন্য আজও প্রাসঙ্গিক। এই সকল দেশের রাজনীতিতে একের পর এক ফ্রাংকেনস্টাইনের সদম্ভ আনাগোনা লক্ষ করা যায়। তাহাদের নিয়ন্ত্রণ না করিয়া সেই সকল দেশে স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন ফিরিয়া আসিতে পারে না। এই সকল দানব তৈরি করিয়া যাহারা ভাবেন, তাহারা তাহাদের লোক, তাহারা আসলে বোকার স্বর্গে বসবাস করিতেছেন। তাহারা কোনো দলের লোক হইতে পারে না। তাহাদের নানা অন্যায়-অপকর্ম এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট তথা যাহা কিছু করিবার লাইসেন্স দেওয়া অপরিণামদর্শিতারই নামান্তর।

অতএব, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে স্থানীয় পর্যায়ে যাহারা ত্রাস সৃষ্টি করিয়া থাকেন, তাহাদের প্রতিরোধ করা উচিত। নতুবা ইহার পরিণতির জন্য ক্ষমতাসীনদের প্রস্তুত থাকিতে হইবে। এই সকল দেশকে তাহারা কোথায় লইয়া যাইতেছে, তাহার কথা চিন্তা করিয়া হইলেও তাহাদের লাগাম টানিয়া ধরিবার সময় আসিয়াছে।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন