বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমাতে প্রয়োজন স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ১৩:৪৮

২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা লেবার পার্টির Edward Samuel Miliband বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে Squeezed Middle শব্দটি চয়ন করেছিলেন। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান ২০১১ সালে শব্দটিকে তাদের Word of the Year হিসেবে বিবেচনা করে। এর সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘এটি এমন একটি শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত সমাজ, যাদের আয় নিম্ন বা মধ্যম স্তরের। এরা মুদ্রাস্ফীতি, মজুরি হিমায়িত ও অর্থনৈতিক সংকটের সময় খরচ কমাতে বাধ্য হয়।’ মুদ্রাস্ফীতি ও এলোমেলোভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার ওঠানামা আমদানি পণ্যের দামকে প্রভাবিত করে শহরাঞ্চলে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে। শহুরে মানুষ সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামাঞ্চলে একটি পরিবারের ভোগ করা পণ্যের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই উত্পাদিত হয় নিজের জমিতে, যা শহরে হয় না। মধ্যবিত্তদের বেশির ভাগই ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নগরজীবনকে আরো মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

শুধু ভোগ্যপণ্যের দাম নয়; স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয় ও নানা ধরনের Utility বিল বেড়েছে। কোভিডের প্রাদুর্ভাব কমে যাওয়ার পর পরিবারের আয় বা বেতন তেমন বাড়েনি। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে পড়েছেন চাকরিজীবীরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে টানা ২২তম মাস বাংলাদেশে গড় মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল মুদ্রাস্ফীতির হারের অনেক নিচে। আমদানি করা হোক বা দেশে উত্পাদিত হোক; সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। চাকরিজীবীদের আয় না বাড়লেও অন্যদের পাশাপাশি তাদেরও ব্যয় বেড়েছে। আর এই ব্যয় বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট আয়ের গোষ্ঠীর জন্য একটি বিশেষ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি যৌক্তিক ও পদ্ধতিগতভাবে দাম বাড়ানো হয়, অর্থাত্ বাজারের মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চলা হয়, তাহলে এই বোঝা নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকবে। কিন্তু, যখন স্বেচ্ছাচারিতা করা হয়, তখন জনগণের পক্ষে এটি খুব কঠিন হয়ে যায়। বেতনকাঠামোয় ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একই বাজার থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হন সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা, কর্মকর্তা, থেকে নিম্নপদস্থ কর্মচারী পর্যন্ত। করপোরেট সিইও থেকে বেসরকারি কোম্পানির একজন সাধারণ স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী একই বাজারের ক্রেতা। আয়ের বৈষম্য আকাশ-পাতাল হলেও বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।

বাজারে শুধু খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তাও কষ্ট সয়ে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা যেত। কিন্তু খাদ্যের বাইরের পরিবহনের ব্যয় ও বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তা আর কোনোক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না গরিব মানুষের ও মধ্যবিত্তের পক্ষে। কেন দাম বাড়ছে? আর কেনই বা দাম বাড়ার গতিতে লাগাম টানা যাচ্ছে না? প্রশ্ন দুটোর সদুত্তর পাওয়া বেশ কঠিন। অর্থনীতিবিদেরা চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের ঘাটতিকে দায়ী করছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু পণ্যের দাম বৈশ্বিক বাজারে চড়া বলে বেশি দামে আমদানি করে আনতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ বাজারের সিন্ডিকেটকে দুষছেন, দুষছেন সরকারের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপকে। মন্ত্রীরা কেউ কেউ মনে করছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় দ্রব্যমূল্য সেভাবে বাড়েনি। তারা বরং বিশ্ববাজারের উচ্চমূল্য ও অস্থিরতাকে প্রধান কারণ মনে করছেন। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন যাবতীয় দায় এই যুদ্ধের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

যে যাই বলুন না কেন, দাম বেড়ে যাওয়ার সংকট যে বেশ গভীর হয়ে গেছে, তা সরকারের একাধিক পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট। যেমন—রমজান মাস উপলক্ষ্যে সারা দেশে ১ কোটি পরিবাবরকে কম মূল্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবির) মাধ্যমে দুই দফায় সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর সরবরাহ করা হচ্ছে। এ জন্য  বিশেষ কার্ড দেওয়া হয়েছে, যা দেখিয়ে কার্ডধারীরা নিয়মিত বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে এসব পণ্য কিনছেন।

এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে নিম্ন আয়ের ভুক্তভোগী মানুষকে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া গেলেও মূল সমস্যার কোনো অর্থবহ সমাধান আসবে না। একইভাবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার দোহাই তুলে দেশের ভেতরের মূল্যবৃদ্ধিকে বৈধতা দেওয়ার প্রয়াসটিও ইতিবাচক নয়। কোনো সন্দেহ নেই, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়তে বাধ্য। প্রশ্ন হলো, তা কতখানি এবং কোন মাত্রায়। আজকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে আগামীকালই চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে খুচরা বাজারের ক্রেতাকে আগের দিনের চেয়ে বাড়তি দাম দিতে হবে কেন? ব্যবসায়ীরা তো রাতারাতি পণ্য বেশি দামে আমদানি করে আনেননি।

বিশ্ববাজারে সব ধরনের সারের দাম নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার আমদানি হয়েছিল ৫৪ লাখ ৯ হাজার টন। এর মধ্যে প্রথম সাত মাস, অর্থাত্ জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সার আমদানিতে মোট ব্যয় হয় ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে সার আনতে ১৮৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। অর্থাত্, এক বছরের ব্যবধানে সারের আমদানি ব্যয় কমেছে ৫১.৪ শতাংশ। যদিও গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষি উপকরণ আগের দামেই কিনতে হচ্ছে কৃষকদের, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বিশ্ববাজারে সারের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তা কমছে না। ফলে উত্পাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু কৃষকদের ব্যয় বাড়বে, বোরোসহ সামনে যে ফসলের মৌসুম রয়েছে, সেগুলোরও ব্যয় বাড়বে। আবার কৃষক ফসল উত্পাদনে যেন সার কম না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে সারের সংকট হলে উত্পাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেটা কৃষক ও ভোক্তার জন্য দুর্ভাবনার কারণ বেশি হবে। দেশে বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে মোট উত্পাদিত চালের ৫৫ শতাংশের বেশি আসে এই মৌসুমে। বোরো উত্পাদনের ওপর সারা বছরের চালের বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।

বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ছে না। ডিজেল, কেরোসিন, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই বেড়ে গেছে কৃষিপণ্যের উত্পাদন খরচ। খেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে সেচ দেওয়া, মাড়াই করা, ফসল ঘরে তোলা, শ্রমিকের মজুরি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে কৃষককে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও লোডশেডিং। বৈশ্বিক খাদ্যসংকট চলাকালে দেশে খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হলে সবার আগে আমাদের কৃষকদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

টিসিবির ট্রাকের পেছনে বিশাল লাইনের বার্তা, নিঃসন্দেহে দরিদ্র মানুষ স্বল্প আয়ে চলতে পারছেন না, কিংবা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না, সেটাই বুঝিয়ে দেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব দরিদ্র লোকের জন্য টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি মোটেই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন থাকলেও লোকলজ্জার ভয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য নিতে অনেকেই আগ্রহী নয়। তাছাড়া দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় প্রয়োজনমতো পণ্য গ্রহণ করা কষ্টসাধ্য। তাই প্রতিটি বাজার, পাড়া ও মহল্লায় কিছু নির্দিষ্ট দোকানে টিসিবি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে।

টিসিবি যেসব পণ্য আমদানি করে, সেগুলোও বেসরকারি ডিলারদের মাধ্যমে করা হয়। ফলে, ভোগ্যপণ্য আমদানির প্রায় পুরোটাই বেসরকারি খাতের হাতে। আবার এদের মধ্যে অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেজন্য অভিযোগ করা হয় যে কতিপয় বড় আমদানিকারক সিন্ডিকেট বা নিজেদের মধ্যে চক্র করে রেখেছে, যাতে অন্য কেউ সেখানে ঢুকতে না পারে। আসলে, এটা ঠিক চক্র নয়, এটা হলো বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের তুলনামূলক প্রতিযোগিতা এবং খরচ সাশ্রয় করার সক্ষমতা, যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলে Economies of Scale।

তবে এই সক্ষমতার শক্তি যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন তা সমস্যা তৈরি করে। সরকারের পক্ষেও একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। আর তাই বাজারে দাম ওঠানামায় এসব বড় প্রতিষ্ঠানই মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে। এরাই পণ্যের দাম নির্ধারণ করে নিজেদের মুনাফা ঠিক রেখে। আমদানির পর পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা বাজারে পণ্য আসতে যে একাধিক স্তর পার হতে হয়, সেখানে দোকান ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ের মতো ব্যয়গুলো মিটিয়ে মুনাফা ধরে বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রে কিছু অদৃশ্য ব্যয় আছে, যা দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। বিশেষত অবৈধ চাঁদাবাজি। এই অবৈধ চাঁদাবাজির বিষয়টি ‘প্রকাশ্য গোপনীয়’ বা ওপেন সিক্রেট। মূলত একধরনের Rent Seeking বা অনুপার্জিত আয়ের বড় ধরনের চক্র তৈরি হয়েছে এখানে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভোক্তার ওপর। সুশাসনজনিত ঘাটতির কারণে এটা বন্ধে বা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের  অভাব প্রবল। অথচ তা করা গেলে দাম বাড়ায় কিছুটা হলেও লাগাম টানা যেত। এদিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধু আমদানি শুল্ক কমিয়ে বা সাময়িকভাবে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে দাম তেমন একটা কমানো যাবে না। দেশে উত্পাদিত পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সঠিক তথ্যের অভাবে কিছু পণ্য অতিরিক্ত আমদানি করা হয়। অথচ একই পণ্য গোডাউনে পচে যাচ্ছে। অতিরিক্ত লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ছাড়ছেন না।  এজন্য সঠিক তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সুপরিকল্পিতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পণ্য আমদানি ও মজুত করা প্রয়োজন। (বাকি অংশ আগামীকাল)

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রেসিডিয়াম সদস্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন