মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অ্যান্টার্কটিকার আবহাওয়ায় উদ্বেগজনক অসংগতি!

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০

বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং এই শতকের একেবারে শুরু হইতে দক্ষিণ গোলার্ধের হিমবাহগুলি ক্রমবর্ধমান হারে গলিতে শুরু করে। বিশেষত, গত দশকের মাঝামাঝি হইতে এই গতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাইতেছে। হিমশীতল অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের এহেন পরিবর্তন গভীর চিন্তা ও উদ্বেগের বিষয় বটে। এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হইবেই-বা না কেন? পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সমগ্র বিশ্বের জন্যই বড় ধরনের হুমকিস্বরূপ। দক্ষিণ মেরুর বরফঢাকা পূর্বাঞ্চলের মালভূমিতে অবস্থিত কনকর্ডিয়া গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা জানাইয়াছেন, ২০২২ সালের ১৮ মার্চ এই অঞ্চলের তাপমাত্রা মৌসুমি গড় তাপমাত্রার চাইতে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়া যায়, যাহা বিশ্ব রেকর্ড। বিষয়টি এক কথায় মাথা ঘুরাইয়া দেওয়ার মতো। কারণ, দক্ষিণ মেরুর তাপমাত্রায় একবারে এত বড় লাফ ইহার পূর্বে কখনোই দেখা যায় নাই। শূন্য অঙ্কের নিচে থাকা তাপমাত্রায় এত বড় পরিবর্তন অসহনীয়। সাউথ পোলের এই জলবায়ু পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের ভাবাইয়া তুলিতেছে। খোদ আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, ‘বিশ্বের সবচাইতে হিমশীতল জায়গার তাপমাত্রায় এমন লাফকে বর্ণনা করার ভাষা আমাদের জানা নাই। আমাদের কেউ ভাবেন নাই যে, এই রকম কিছু ঘটিতে পারে। দক্ষিণ মেরুর এই তাপমাত্রা সাধারণ সীমার বাহিরের বিষয় এবং ইহা যথেষ্ট উদ্বেগেরও বিষয়।’

শীতলতম মহাদেশে তাপমাত্রার এমন বিশাল বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। গত দুই বছর ধরিয়াই অ্যান্টার্কটিকার আবহাওয়ায় উদ্বেগজনক অসংগতি লক্ষ করা যাইতেছে। বিশেষ করিয়া পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকে শতাব্দীরও অধিক সময় ধরিয়া জমিয়া থাকা বরফের চাই ও হিমবাহগুলি ক্রমবর্ধমান হারে গলিতে শুরু করিয়াছে। ইহার ফলে মহাদেশটির চারিপাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়িতেছে ক্রমশ। দক্ষিণ গোলার্ধে জলবায়ুর এই অভাবনীয় পরিবর্তন কীসের বার্তা? বস্তুত ইহা এই আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষের বোকামির জন্য অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত বদলাইয়া যাইতেছে। বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাব এই মহাদেশেও খুব বাজেভাবে পড়িতেছে এবং অ্যান্টার্কটিকার এহেন পরিবর্তন পুরা মানবসভ্যতার জন্য মহাবিপদ ডাকিয়া আনিবে নিশ্চিতভাবে। অ্যান্টার্কটিকার বাস্তুতন্ত্র তো বটেই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলিবে। বিশ্বকে এখন এমন কিছুর সহিত লড়াই করিবার জন্য প্রস্তুতি লইতে হইতে পারে, যাহা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।

অ্যান্টার্কটিকার আবহাওয়া বিগড়াইয়া যাওয়ার অর্থ হইল, তামাম দুনিয়ায় তাহার উদ্বেগজনক প্রভাব অনুভূত হওয়া। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ভিতর দিয়া যাইতেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি। প্রচণ্ড দাবদাহ ও খরা পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যে বেসামাল হইয়া উঠিয়াছে এই অঞ্চলের জনজীবন। প্রচণ্ড দাবদাহের কারণে অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হইতেছে। দীর্ঘ খরার অভিঘাত লক্ষ করা যাইতেছে কৃষিপণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রেও। মাসের পর মাস বৃষ্টি না হওয়ায় ফসল উত্পাদন ব্যাহত হইতেছে বিভিন্ন দেশে। উপরন্তু উপকূলীয় এলাকায় পানির তাপমাত্রা এতটাই বাড়িয়া যাইতেছে যে, প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা করিতেছেন বিজ্ঞানীরা। ইহা নিঃসন্দেহে ‘ঐতিহাসিক দাবদাহ’।

এমনটা যে ঘটিবে, সেই হুঁশিয়ারি গত দুই দশক ধরিয়াই দিয়া আসিতেছিলেন পরিবেশবিদরা; কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাইতে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই। জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ১৯৭০ হইতে ২০২০—এই ৫০ বত্সরে বিশ্বের তাপমাত্রা যেই গতিতে বৃদ্ধি পাইতেছে, বিগত ২ হাজার বত্সরেও এত দ্রুত হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা ঘটে নাই। অথচ জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায় যেন নির্বিকার! আবহাওয়ার চরিত্র বদলে যাওয়ার কারণে দেশে দেশে একটার পর একটা বৃহত্ দুর্যোগ আঘাত হানিতেছে। জলবায়ু সম্পর্কিত ও জিওফিজিক্যাল বিপর্যয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বাড়িতেছে। বাড়িতেছে বাস্তুচুত্যির ঘটনা। আজিকার দিনে আমরা যেই সকল জটিল রোগব্যাধি, মহামারির বিস্তার লক্ষ করিয়া থাকি, তাহাও বিরূপ আবহাওয়ার বিষফল। এই অবস্থায় বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও টিকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হইলে, পরিবেশকে দখল-দূষণমুক্ত করা না গেলে দাবদাহের কবলে নিপতিত হইয়া বিশ্ব পুড়িবে, মরিবে মানুষ। সুতরাং নিজেরা সুস্থভাবে বাঁচিবার স্বার্থেই ব্যক্তি পর্যায় হইতে শুরু করিয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিবেশের সুস্থতা নিশ্চিতে সকলকে সোচ্চার হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন