হাসান ইমাম
আভিধানিক অর্থ যা-ই হোক, দেশের প্রশ্নে ‘মালিকানা’ শব্দের বাংলাদেশি সংস্করণ ভিন্ন। জনগণ দেশের মালিক—সাংবিধানিক এই অধিকারের প্রায়োগিক চিত্রকে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ট্রাজেডি হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে। আর, জনগণকে ‘তালপাতার সেপাই’ বানাতে সবকিছু যেভাবে সাজানো থাকে—তার পাঠ আজ সবাই কমবেশি নিতে সক্ষম!
বলাই বাহুল্য, এই অক্ষরজ্ঞানের জন্য অ আ ক খ চেনার মতো কিতাবি তালিম লাগে না। রাষ্ট্র-সমাজ এমন এক পাঠশালা, যেখানে বহুবিধ ব্যবহারিক শিক্ষণ জারি; জনগণ হররোজ ডোজ ডোজ খেসারত দিয়ে তা শেখে। যেমন গ্যাসের দাম বাড়ানোয় এখন থেকে প্রতিমাসে বেশি টাকা গচ্চা দেওয়ার ‘পাঠ’ নেবে জনগণ। প্রশ্নটা স্বাভাবিক, মালিকই যদি হয়, তবে দেশের জন্য এটুকু করবে না জনগণ? তাদের তো আর দেশ চালানোর মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে না। তার জন্য কর্মীবাহিনী (সরকার) আছে। তারাই সব সামলে-সুমলে নিচ্ছে। বিনিময়ে একটু-আধটু ত্যাগ স্বীকারও করবে না? তা হয়!
হক কথাই বটে। তবে কথার পিঠেও কথা আছে। কর্মীদের কেরামতিতে মালিক কেবল নামে আছে, অধিকারে নেই। আইন-কানুনও তেমনি কিতাবে আছে, প্রয়োগে সামান্য। আইন অনুযায়ী, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভে থাকলে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের কথাই উঠতে পারে না। এক সুন্দরবন ছাড়া বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাখরাবাদ ও কর্ণফুলীসহ পাঁচটিই লাভে আছে। লাভ গুনছে একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলও। কিন্তু এসবই উপেক্ষা করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলো আবাসিক-বাণিজ্যিকের প্রায় সব খাতে। অথচ তিতাসে প্রতিমাসে গ্যাসের ‘সিস্টেম লস’ ১২ শতাংশ। অর্থাত্ সরবরাহ করা গ্যাসের ১২ শতাংশ বেহাত হয়, যার বাজারমূল্য মাসে ৭০০ কোটি টাকা। মানে বছরে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, কিন্তু কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।
এই ‘ব্যবস্থাগত’ চুরি ঠেকানোর কোনো তাগিদ কর্তৃপক্ষের আছে, তা অন্তত দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেনি। গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো—তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দরকার হবে ১৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এই বিপুল ঘাটতির সংস্থান সরকারের পক্ষে একা সম্ভব নয়। সুতরাং গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু বছরে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকার গ্যাস চুরি ঠেকানোর নৈতিক দায় সরকার বোধ করে না!
যে চুরিতে ‘সিস্টেম’ শব্দ থাকে, তাকে ‘আনুষ্ঠানিক’ বললে কি দোষের হয়? যদি না হয়, তখন অযৌক্তিক, বেআইনি—এসব কথার কোনো ‘মানে’ থাকে কি? চুরির বন্দোবস্ত যখন বিদ্যমান ব্যবস্থাই ‘নিশ্চিত’ করে এবং প্রতিকারের কোনো বালাই থাকে না, তখন অব্যবস্থাই যে ব্যবস্থা, তা বুঝতে অক্ষরজ্ঞানহীন জনগণেরও বেগ পেতে হয় না। অব্যবস্থাপনায় আইন মোতাবেক সিদ্ধান্ত তখন আর কীভাবে হতে পারে? যেমনটি হয়নি গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও। তবু এই অব্যবস্থার ভেতরও ‘ব্যবস্থা’র কথা কমবেশি আলোচিত হয় এখানে-ওখানে। গ্যাস বাড়ানোর তোড়জোড়ের শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক অধিকার সংগঠন এর বিরোধিতায় সরব থেকেছে। এখনো এর বিরুদ্ধে সমান উচ্চকণ্ঠ তারা। মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করে দাবি তুলে ধরা হয়েছে বারংবার। দাম বাড়ানোর আপত্তি তুলেছিল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও। কিন্তু এর কিছুই কানে নেয়নি কর্তৃপক্ষ, নিচ্ছেও না।
কথা কানে না নেওয়ার সুবিধা নিশ্চয়ই আছে; যে সুবিধা কর্তৃপক্ষ ভোগ করছে। বাইরে যা খুশি হাউকাউ হোক, কান বন্ধ তো ঘুম জম্পেশ। কিন্তু কথা কানে না নিতে নিতে একসময় কানের কার্যকারিতাই নষ্ট হওয়ার দশা হবে। তখন কিন্তু নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালিতেই সমস্যায় পড়তে হতে পারে কর্তৃপক্ষকে। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদে কান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত একবার খতিয়ে দেখা যেতে পারে বৈকি।
n লেখক : সাংবাদিক
