নদী রক্ষার রায়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা

নদী পুনরুদ্ধারের ব্যয় বহন করবে দখলদাররা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ২২:১৫

নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছে হাইকোর্ট। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদেরকে এখন থেকে জরিমানা গুনতে হবে। আদালত বলেছে, তুরাগ নদীতে ব্যাপকহারে যে দূষণ ও দখল হয়েছে তা পুনরুদ্ধারে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে তা কি পুনরুদ্ধার হবে? কিংবা যিনি অবৈধ দখল বা দূষণে জড়িত তিনি দখল ও দূষণ পুনরুদ্ধারের সকল খরচ বহন করবেন? যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা পরিবেশ দূষণ করবে, নদ-নদী দূষণ ও দখল করবে তাকেই পরিবেশ দূষণ, নদ-নদী দূষণ ও দখল পুনরুদ্ধারের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। অর্থাত্ দূষণ ও দখল পরবর্তী অবস্থায় ফেরত যেতে যাবতীয় ক্ষতিপূরণ দূষণকারী ও দখলকারীকেই প্রদান করতে হবে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো.আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আদালত বলেছে, আগাম প্রতিরোধের নীতি এবং দূষণকারী কর্তৃক ক্ষতিপূরণ               প্রদানের নীতি দেশের আইনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কারণ নদীকে হত্যা করার অর্থ হলো বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে হত্যা করা। নদী দূষণ এবং দখলকারী দেশের শত্রু, স্বাধীনতার শত্রু ও মানবতার শত্রু। এরা মানবজাতি ও সভ্যতার হত্যাকারী। দেশের সকল নদ-নদীকে অবশ্যই দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ-চলাচলের  উপযোগী করতে হবে। এদিকে এ রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি বই আকারে বাঁধাই করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার জেনারেল জ্যেষ্ঠ জেলাজজ ড. মো. জাকির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, রায়ের অনুলিপি ওঠানোর কাজ চলছে। এরপর তা বই আকারে বাঁধাই করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এজন্য যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে তা অনুসরণ করা হবে।

বিআইডব্লিউটিএর তত্পরতা দেখা যায় না

রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, বিআইডব্লিউটিএর চোখের সামনে যখন নদী ভরাট হচ্ছে তখন এ সংস্থার কোনো তত্পরতা দেখা যায় না। কোনো শ্রমিক, কৃষক, মজুর নদ-নদী দখল করে না। নদী দখল করে বিত্তশালী ব্যক্তি, বড়ো বড়ো কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠান। নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বিএডিসিসহ পরিকল্পনা কমিশন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এতগুলো মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের সম্মুখে নদ-নদী দখল হচ্ছে ক্রমাগতভাবে। রায়ে বলা হয়, নদী দখল ও দূষণকে অপরাধ গণ্য করে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনও নেই। স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভার কর্মকর্তা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চোখের সম্মুখে নদী দখল হচ্ছে। একে অন্যের ওপর দায়িত্ব ও দোষ চাপিয়ে প্রকারান্তরে প্রত্যেকেই নদী দূষণ ও দখলদারকে নদী দূষণ ও দখলে সাহায্য সহযোগিতা করছে। সেজন্য দেশের সকল নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য হলো এসব জাতীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তিমালিকানা কিংবা বাণিজ্যিক ব্যবহার  থেকে রক্ষা করা।

রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া উচিত

হাইকোর্ট বলেছে, ঢাকা শহর এবং এর চারপাশের নদী রক্ষা করতে হলে এ শহরের ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ অবশ্যই কমাতে হবে। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী সিদ্ধান্তটি হবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে দূরে কোনো সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাওয়া।

দায়ী ব্যক্তিদের জনগণের সামনে

উপস্থাপন জরুরি

হাইকোর্ট রায়ে বলেছে, তুরাগ নদীর পাড়ে প্রাসাদসম বাড়ি, ছোটো-বড়ো বাণিজ্যিক শিল্প-কারখানা এবং অবৈধ স্থাপনাসমূহ একদিনে তৈরি হয়নি, লেগেছে দীর্ঘ সময়। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সকল দায়িত্বশীল সরকারি ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধি কোনো এক অজানা কারণে এ ব্যাপারে ছিল নিশ্চুপ। তাই দায়ী সকল ব্যক্তিকে জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন করা জরুরি। রায়ে বলা হয়, সর্বোচ্চ আদালত থেকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে নদী রক্ষায় দিকনির্দেশনা দেওয়া না হলে আজ হয়তো বুড়িগঙ্গার ওপর কোনো বহুতল বাণিজ্যিক ভবন কিংবা তুরাগের ওপর হয়তো কোনো অবৈধ ভূমি দখলদারের আবাসন প্রকল্প দেখা যেত।