মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কেউ হাউমাউ করে কাঁদেন, কেউ নীরবে অশ্রুপাত করেন 

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪১

‘মায়ের মতো সন্তানের জন্য এমন দরদি এই ভবে আর কেউ হবে না’- ঈদের দিনে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি গাজীপুরের হোতাপাড়া বিশিয়া কুড়িবাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন যে একদল বৃদ্ধ মা বারান্দায় বসে এই গান গেয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছেন। ঐ সময় তাদের কাছে ঈদের দিনে সন্তান কিংবা আপনজন খবর নিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে অনেকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। কেউ কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলেন। কেউ-বা বলে ওঠেন ঈদের দিনে নিজে কাপড় না কিনে আদরের ছেলেমেয়েকে কাপড় কিনে দিয়েছি। ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধরেছি। শীতের দিনে সন্তানকে নিরাপদে রাখার জন্য কি না কষ্ট করেছি। অথচ সেই সন্তানেরাই তার মায়ের খোঁজ নেয়নি ঈদের দিনে।

তারা বলেন, ভেবেছিলাম অন্তত এই দিনে সন্তান বা আপনজন একবার হলেও খোঁজখবর নিতে আসবে। প্রতি ঈদে আমাদের এমন প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু সন্ধ্যা শেষ হয়ে যখন অন্ধকার রাত এলো ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সন্তান বা আপন জন খোঁজ নিতে আসেনি।

শেষমেশ চোখ মুছতে মুছতে তারা চলে যান কক্ষের ভেতরে। আবার কাউকে দুই হাত উঠিয়ে বলতে দেখা গেছে, আল্লাহ এত কষ্টে সন্তানদের বড় করেছি, তুমি তাদেরকে নিরাপদে রেখ। এই দোয়াও করতে দেখা গেছে। ঐ সময় উপস্থিত কিছু সংখ্যক দর্শনার্থী ও বৃদ্ধাশ্রমের কর্মকর্তারা এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

গাজীপুরের বিশিয়া কুড়িবাড়ী বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্রের এক বৃদ্ধ মা

তখন এক শিক্ষিত মা একুশে পদকপ্রাপ্ত গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীরের গাওয়া গানটি সুর করে বলতে থাকেন- ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোশ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না এমন দরদি ভবে কেউ হবে না, আমার মা গো।’ এই দুই লাইনের গানের সুর শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। মুহূর্তে বৃদ্ধাশ্রম জুড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

বৃদ্ধ মায়েদের একজন শহর বানু (৭০)। কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার বাসিন্দা তারা মিয়ার স্ত্রী। স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র ছেলে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এলাকার এক ব্যক্তি তাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান। দুই বছর যাবৎ তিনি এখানে অবস্থান করছেন। মাঝেমধ্যে ছেলেকে ফোন দিলেও রিং হলে তিনি কেটে দেন।

কুমিল্লার ময়নামতি এলাকার বাসিন্দা নূর মিয়ার স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৬৫) তাদের সংসারে দুই মেয়ে রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর ফিরোজা বেগমের জীবনে একের পর এক কষ্টের কাহিনি ঘটতে থাকে। আপনজনরা তাকে সহযোগিতা করেনি। দুই মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। এক বছর আগে এই বৃদ্ধাশ্রমে আসেন। এখানে নিরাপদে আছেন বলে জানান। চাঁদপুর ফরিদগঞ্জের আব্দুল মান্নানের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৬৫) তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। খিলগাঁওয়ের তালতলায় থাকতেন। তাদের সুখের সংসার। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানরা তাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। তিনি আশ্রয় নেন এই বৃদ্ধাশ্রমে। এই বৃদ্ধাশ্রমে তাদের মতো আরো ৭২ জন বৃদ্ধ নারী রয়েছেন। প্রত্যেকের জীবনে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। সবুজ ছায়াঘেরা সুন্দর পরিবেশে তারা বসবাস করছেন। একে অপরের আপনজন হয়েছেন। থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসাসেবা কোনোটির কমতি নেই এখানে। তাদের সারা দিন কাটে জীবনে ঘটে যাওয়া সুখ-দুঃখের কাহিনি একে অপরের সঙ্গে বিনিময় করে।

ইত্তেফাক/কেকে