সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৩০

সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। বর্তমানে নানাবিধ সামাজিক সমস্যাগুলো আমাদের মধ্যকার সৌহার্দ, সম্প্রীতি, ঐক্য এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান উপাদানগুলোকে ক্রমেই গ্রাস করছে। কার্যত সমাজের অচলায়তন ও অধঃপতনের ক্রমধারা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত করছে। যদি আমরা এখনই এটা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারি, বলাই বাহুল্য, এর খেসারত অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি দিতে হবে। বলছি, নব্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সমস্যা ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে। এই সমস্যা এতটাই গুরুতর যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন! সরকারপ্রধান সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ‘ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে কিশোর গ্যাং মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তত্পরতা চালাচ্ছে, কিন্তু তার পরেও রোধ করা যাচ্ছে না।

ঢাকার একটি এলাকায় পূর্বে কিশোর গ্যাং লক্ষ করা যায়। এখন সেই কিশোর গ্যাং ঢাকায় প্রত্যেক এলাকায় ছড়িয়েছে। সারা দেশে, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে কিশোর গ্যাং, যারা মানুষ হত্যাসহ প্রায় সব অপরাধের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। তবে বিশেষ করে রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে কিশোর অপরাধ ও গ্যাং ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মূলত, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেই উদীয়মান কিশোররা বেপরোয়া হয়ে পড়ছে।

অতীতে একটা সময়ে সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষায় পরিবার ও স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল। তারা কিশোরদের উশৃঙ্খল আচরণে প্রশ্রয় দিতেন না। এখন মুরুব্বিদের হারানোর জায়গাটি নিয়েছেন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুবিধাবাদীরা। তারা কিশোরদের ব্যবহার করেন। ‘বড় ভাই’ নামে সমাজে পরিচিত তারা। যারা কিশোর গ্যাংয়ের নামে অপরাধ কার্যক্রম চালায়, চাঁদা তোলা এবং আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কিশোরদের ব্যবহার করে। আবার এই অর্থের একটা অংশ কিশোরদের জন্য ব্যয় করা হয়। এই কিশোর অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে হয়ে যায় সন্ত্রাসী। তবে এই সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই, আছে বড় ভাইদের ছত্রছায়া। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অন্তত কয়েক জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ‘কিশোর গ্যাং’ প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে কিশোর গ্যাং পরিস্থিতির ভয়াবহতা জানান দিচ্ছে। পুলিশের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে একটি জাতীয় গণমাধ্যমে বলা হয়, সারা দেশে ১৭৩টি ‘কিশোর গ্যাং’ রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধজনিত কারণে এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৭৮০টি। এবং এসব মামলায় প্রায় ৯০০ জন আসামি আছে। ঢাকা শহরে কিশোর গ্যাং রয়েছে ৬৭টি। ২০২২ সালের ঐ প্রতিবেদন প্রকাশের দেড় বছর অতিক্রম করেছে। এই সময়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। গত ১০ এপ্রিল, ২০২৪ চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের কবল থেকে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন একজন চিকিত্সক। এবং পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম নগরে ৫ থেকে ১৫ জন সদস্যের অন্তত ২০০ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। নগর জুড়ে এদের সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০। ২০২৩-এর জুলাই থেকে চলতি বছরে এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের প্রধানসহ ২০০ জনের বেশি গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-পুলিশ। বর্তমানে বিচারাধীন ২ হাজার ২৩২টি মামলার বেশির ভাগ কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত।

পুলিশের অনুসন্ধানের বাইরেও ঢাকায় আরো ১৪টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং আছে। ২০২৩ সালে যাদের হাতে শুধু ঢাকাতেই ২৫ জন নিহত হয়েছেন। ২০২২-২৩ দুই বছরে তাদের হাতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে (ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ)। ঢাকার অদূরে সাভারেও কিশোর গ্যাংয়ের উত্পাত বেড়েছে। চলতি বছর মার্চ মাসে সেখানে চারটি খুনের ঘটনায় সরাসরি সংশ্লিষ্টতা মিলেছে কিশোর গ্যাংয়ের। অর্থাত্, এদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে অপরাধ প্রবণতার সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। নাম কিশোর গ্যাং হলেও এসব বাহিনীর সদস্যরা বেশির ভাগই ১৮ বছরের বেশি বয়সী। ২০২৩ সালে রাজধানীতে সংগঠিত ২৫টি খুনের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এদের বিভিন্ন অপরাধের মধ্যে রয়েছে—ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখলে ভাড়া খাটা, উত্ত্যক্ত করা, হামলা, মারধর ও খুন। হিরোইজম ও আধিপত্য ধরে রাখতেও বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘর্ষ, বিবাদ ঘটে হরহামেশাই।

যে কোনো সমস্যা নিরসনে সেটার মূলে যাওয়াটা জরুরি। এই যে গ্রেফতার, মামলা ও অভিযান চালিয়েও কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা কমছে না, বরং নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। এমনকি গ্রেফতারে সহায়তাকারীর ওপর অভিযুক্ত কর্তৃক হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ উদ্ঘাটন করাটা এখন জরুরি। আমরা সমস্যাকে গুরুত্ব দিই ভালো কথা, কিন্তু সমস্যার গভীরে গিয়ে তা মূলোত্পাটনের উপায় বাতলে দেওয়ার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। উপরন্তু, কিছু সংবাদমাধ্যমে কিশোর গ্যাং অভিযুক্তদের ছবি ছাপিয়ে এবং টেলিভিশন চ্যানেলে ঘটনাগুলোর ভিডিও দেখানো হচ্ছে। এটা সমাধান কিংবা পরিস্থিতি মোকাবিলার যথাযথ উপায় নয়। এ ধরনের বিষয়গুলো প্রতিরোধে নিতে হবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। যেমন অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে, সেটা বরং গণমাধ্যমে প্রচার করা জরুরি। তাহলে অপরাধীরা বুঝতে পারবে যে, তাদের পরিণতি কী হতে পারে।

যে কোনো সামাজিক সমস্যায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। এখন তথ্য-প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগ। এই সময়ে শিশু-কিশোররা অনলাইনে অনেক কিছু দেখে, যার ভেতরে নেতিবাচকতা বেশি এবং তারা সহজেই সংগঠিত হয়। শহরগুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নাই, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। শরীরচর্চা, খেলাধুলার সঙ্গে সংস্কৃতির চর্চা থাকলে কিশোর-তরুণেরা অপরাধ ও মাদক থেকে দূরে থাকে। আমাদের সেই ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। পথশিশু ও অভিভাবকহীনদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এনে সুশিক্ষিত করতে প্রয়োজনী পদক্ষেপ নিলে সুফল মিলবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিতে পারে।

আমি নিজে ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে ধূমপান ও মাদকবিরোধী কথা বলেই যাচ্ছি। একটা সময় বিষয়গুলোকে পাত্তা দেওয়া হতো না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভাবনা পালটে গেছে। দেশে তামাক উন্নয়ন বোর্ড থেকে ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ এবং ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ বাস্তবায়ন এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। সরকার মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। কিছু ছোট বিষয় থাকে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধূমপান ও মাদক গলার কাঁটা হয়ে গেছে কিশোর-তরুণদের জন্য। কিশোর গ্যাং অপসংস্কৃতি এবং প্রায় সব সামাজিক অপরাধের মূলেই রয়েছে মাদক, যার শুরুটা হয় মূলত ধূমপান থেকে। দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ-কিশোর। অন্য দিকে, মাদকাসক্তির বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে ধূমপানকে। ধূমপান হচ্ছে মাদকের রাজ্যে প্রবেশের মূল দরজা। এমনিতেই তামাক ও মাদকের আগ্রাসনে তরুণেরা বিপথগামী হয়ে পড়ছে। উপরন্তু, নাটক-সিনেমায়ও তরুণদের আইডল ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা নায়ক-নায়িকাদের দ্বারা ধূমপানে, মাদকে উত্সাহিত করে এমন দৃশ্য অহরহ প্রচার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিগারেট কোম্পানিগুলোর বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার বাড়ছে। যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটা রীতিমতো উদ্বেগজনক! সুতরাং, বসে থাকার সময় নেই। তরুণদের রক্ষায় কাজ করতে হবে।

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে ভিন্ন দৃষ্টির কথা বলেছেন, সেটার একটা দিক হচ্ছে প্রতিরোধ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তার খোঁজ রাখা অভিভাবকদের অত্যাবশ্যকীয় কাজ। শিশু-কিশোরদের মেধা ও সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক মনন বিকাশে পরিবার, সমাজ, সরকারি সব পদক্ষেপের সঙ্গে আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। নতুবা এর পরিণাম থেকে আমরা কেউ মুক্ত থাকতে পারব না। তাই আসুন, আমরা কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করি।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন