মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ডিপফেক লইয়া ডিপ উদ্বেগ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৩০

বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য উন্নতির ফলে বিশ্বব্যাপী তথ্য ও প্রযুক্তিতে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। যাহার ফলে মানুষের জীবনযাপনেও বহুমাত্রিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হইতেছে। তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা যেমন ধীরে ধীরে উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করিতেছি, তেমনি ইহার অপব্যবহার আমাদের সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দিতেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করিয়া বর্তমানে এমন সমস্ত কার্য সাধন করা হইতেছে, যাহা কয়েক বত্সর পূর্বেও অসম্ভব বলিয়া বিবেচিত হইত; কিন্তু ইহা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিস্ময়ই নহে, বরং সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হইয়া উঠিয়াছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনো ছবি বা ভিডিওকে বিকৃত কিংবা নিখুঁতভাবে তৈরি করিয়া হুবহু আসলের মতো প্রচার করা হইতেছে। বিষয়টি প্রযুক্তির জগতে ডিপফেক নামে পরিচয় লাভ করিয়াছে। ইদানীং ডিপফেক প্রযুক্তি সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

এই ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মুখে বসাইয়া দেওয়া হইতেছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনগড়া কথা। সেইগুলি আবার ছড়াইয়া পড়িতেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ইন্টারনেটে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হইতেছে। দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই, সেইগুলি আসল নাকি নকল। কিছুদিন পূর্বে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত অ্যামেরিকান সুপারমডেল বেলা হাদীদের মুখ ব্যবহার করিয়া চলমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ লইয়া মিথ্যা রাজনৈতিক বক্তব্য ছড়ানো হইয়াছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলিতে, যাহা জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিয়াছিল। ডিপফেক প্রযুক্তির এমন অপব্যবহারের কারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হইতে অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা সাধারণ জনগণ—সকলেই পড়িতেছেন বিপাকে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এতদিন মানুষের ভাবমূর্তি নষ্ট হইত; কিন্তু এখন ইহার সাহায্যে বিভিন্ন প্রতারকচক্র মানুষকে জুয়ার ফাঁদে ফালাইয়া হাতাইয়া লইতেছে কোটি কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা তারকার মুখ ও কণ্ঠ ব্যবহার করিয়া তৈরি করা হইতেছে লোভনীয় বিজ্ঞাপন। এই সমস্ত বিজ্ঞাপনে দেখানো হইতেছে জুয়া খেলিয়া কোটি কোটি টাকা কামানোর গল্প। অনলাইন গেম খেলিয়া জিতা যাইতেছে কাড়ি কাড়ি টাকা, যাহা নিমিষেই চলিয়া আসিতেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্টে। তথ্যগুলি এত নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হইতেছে—সেইগুলি যে নকল, তাহা সাধারণ দৃষ্টিতে বুঝিয়া উঠা দায়। এই ধরনের বিজ্ঞাপনের ফাঁদ পাতা হইয়াছে মূলত দেশের তরুণ সমাজকে প্রলুব্ধ করিবার জন্য। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নজরকাড়া বিজ্ঞাপন অবাধে প্রচার হইতেছে। আর লোভনীয় এই অনলাইন জুয়ার ফাঁদে ফালাইয়া বাংলাদেশ হইতে দেশিবিদেশি সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে।

অপরাধজগতে ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হইল, ইহা ক্রমশই নিখুঁত হওয়ার পাশাপাশি অধিকতর সহজলভ্য হইতেছে। একটা সাধারণ আন্ড্রয়েড ফোনের মাধ্যমেও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিবার সুযোগ রহিয়াছে। যাহার ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দুঃসাধ্য হইয়া যাইতেছে। এই মুহূর্তে আসিয়া সকলেই বুঝিতে পারিয়াছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উক্ত সমস্যা একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নহে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক এই প্রযুক্তির সাহায্যে অপতথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানো বন্ধ করা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করিতে হইবে। ডিজিটাল জগতে প্রযুক্তির ব্যবহারে যেমন প্রতারণা করা যায়, তেমনি প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতারণা শনাক্ত করিবার সুযোগও রহিয়াছে। শুধু তরুণ প্রজন্ম নহে, সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে কীভাবে অপতথ্য বিশ্লেষণ ও রোধ করা যায়, সেই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করিবার সময় আসিয়াছে। জনসাধারণের বুঝাইতে হইবে যে, ডিজিটাল জগতের বিশুদ্ধতা রক্ষায় সমাজের প্রতিটি মানুষের ভূমিকা ও দায়িত্ব রহিয়াছে। 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন