মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মধ্যপ্রাচ্য-সংকট

বৃহৎ সংঘাতে ক্ষতিও বৃহৎ

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৮

ইসরাইলকে লক্ষ্য করে গত ১৩ এপ্রিল তিন শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বলা বাহুল্য, এটা ছিল ইসরাইলি ভূখণ্ডে ইরানের প্রথম সরাসরি সামরিক হামলা। ইরানের নজিরবিহীন হামলার জবাবে ইসরাইল কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায়, তা নিয়ে জল্পনাকল্পনার শেষ ছিল না স্বাভাবিকভাবেই। এরূপ প্রেক্ষাপটে শুক্রবার সকালে (১৯ এপ্রিল) ইরানে ইসরাইল হামলা চালিয়েছে বলে জানা যায়। যদিও ইসরাইলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। এমনকি তেহরানও বিবৃতিতে জানায়, বাইরের কোনো শক্তি থেকে ইরানি ভূখণ্ডে হামলার ঘটনা ঘটেনি। অর্থাত্, ইসরাইলের সামরিক প্রতিক্রিয়া একপ্রকার অস্পষ্টই রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেলআবিব, যাকে মূলত গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ‘প্রতিশোধমূলক হামলা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জানিয়ে রাখার বিষয়, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রথমে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে যুদ্ধের সৃষ্টি হয় গত বছরের ৭ অক্টোবর। হামাসকে গোপন সমর্থনের মাধ্যমে এই যুদ্ধে ইরান আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠতে থাকে। একইসঙ্গে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লোহিতসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দায়ও গিয়ে পড়ে তেহরানের কাঁধে। এসবের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র প্রক্সিগ্রুপকে গোপনে অস্ত্র ও অর্থসহায়তা দিয়ে আসার পুরোনো অভিযোগ তো ছিলই তেহরানের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে দুই চিরশত্রু ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছিলেন বিশ্লেষক মহল। বিশ্লেষকদের অনুমান শেষমেশ বাস্তবে পরিণত হয়ে ওঠে ইরান-ইসরাইলের পালটাপালটি হামলার মধ্য দিয়ে।

ইসরাইলের মাটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর স্বভাবতই আশঙ্কা ছিল, ভয়াবহ মাত্রার পালটা জবাব আসবে ইসরাইলের পক্ষ থেকে। যদিও ইরানে হামলা না চালানোর জন্য ইসরাইলকে নিষেধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যাহোক, ইরানে ইসরাইলের হামলা তথা ইসরাইলি প্রতিক্রিয়ার পর যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো, তেহরান ও ইসরাইল—এ দুই আঞ্চলিক শক্তি আপাতত থেমে গেছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে। বিপজ্জনক কিছু ঘটার আশঙ্কা আপাতত নেই!

ইরানে হামলার ঘটনার কিছুক্ষণ পর এক আঞ্চলিক গোয়েন্দা সূত্র সিএনএনকে জানায়, ইরান এ নিয়ে নতুন করে আর কোনো প্রতিক্রিয়া জানাবে না বলেই মনে হচ্ছে। অর্থাত্, দুই শত্রু রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি ‘স্টেট টু স্টেট স্ট্রাইক’ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। তবে জেনে রাখার বিষয়, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তাপ এ দুই পরাশক্তি তো বটেই, গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ঘনীভূত অস্থির পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিল। উপরন্তু, মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ বেঁধে যাওয়াটাও যে অস্বাভাবিক নয়, তা-ও স্পষ্ট হলো তেহরান-তেলআবিব পালটাপালটি হামলার মধ্য দিয়ে।

একটা বিষয় লক্ষ করার মতো, সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেট ভবনে হামলা চালিয়ে কয়েক জন জ্যেষ্ঠ ইরানি কমান্ডারকে হত্যা করার ঘটনাকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে চাইছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা মনে করেন, এই হামলা ছিল ইসরাইলি প্রতিক্রিয়ার ‘প্রাথমিক অধ্যায়’। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইল ইরানকে বাজিয়ে দেখল। এমনও বলছেন অনেকে, তেহরান এবং ইরান-সমর্থিত লেবাননের হেজবুল্লাহর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা কমান্ডারদের নিহত হওয়ার ঘটনায় ইসরাইল শক্তিশালী শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছে। বিশ্লেষকদের অভিমত, খুব ভেবেচিন্তেই এই হামলা চালানো হয়।

ভুলে গেলে চলবে না, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যা ঘটে, তা সচরাচর দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তাতে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন পক্ষ। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল মূলত গভীরভাবে আন্তঃসংশ্লিষ্ট। বহু ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ ঘিরে রেখেছে এই অঞ্চলকে। কোনো একটা পক্ষ যদি সামরিক পদক্ষেপের পথে পা বাড়ায়, ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সম্ভাব্য সামরিক দাবানলের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে এগিয়ে আসে বিপরীত পক্ষের মিত্ররা। আমরা দেখেছি, চলমান গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ইসরাইলের একধরনের ঠান্ডা সম্পর্ক শুরু হয়েছিল। দামেস্ক হামলার পর মার্কিন কর্মকর্তারা একটা সময়ে এমনও বলেছিলেন, ইসরাইলের ওপর ইরানের আক্রমণ হলে তার প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলকে সঙ্গ দেবে না ওয়াশিংটন। তবে দিনশেষে আমরা দেখেছি ভিন্ন চিত্র। ইরান থেকে ইসরাইলে যেসব মিসাইল ও ড্রোন ছোড়া হয়, তার প্রায় সবটাই ঠেকিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। ইরানের নিক্ষেপ করা ৭০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ধ্বংস করেছে মার্কিন বাহিনী একাই। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়, মুখে যাই বলুক না কেন, মিত্র ইসরাইলকে রক্ষার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই আন্তরিক।

তবে এ কথাও সত্য, ইরানে ইসরাইলের পালটা আক্রমণের বিষয়ে কোনো ধরনের সায় ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের। ওয়াশিংটনের বেশ ভালোমতোই জানা, পালটাপালটি হামলার ঘটনা এই বিস্তৃত অঞ্চলকে অজানা অন্ধকার গলির দিকে ঠেলে দেবে নিশ্চিতভাবে।

অন্যদিকে, তেহরানও আঞ্চলিক হিসাবনিকাশ বিবেচনায় নিয়ে এগোচ্ছে। সম্ভবত এ কারণেই বেশ সংযমী আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে ইরানের কাছ থেকে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্বের পথে ইরান। এ দুই শক্তি আবার মার্কিন মিত্র। ফলে স্বভাবতই বুঝেশুনে এগোতে চাইছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। এই অঞ্চলে ইরানের হাত ধরে কোনো অশান্তি সৃষ্টি হলে তা তেহরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ককে শীতল করে তুলতে পারে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই রাইসি মূলত বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।

এবার আসি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিষয়ে। নেতানিয়াহু যে মহা সুখে আছেন, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং দেশের অভ্যন্তরে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। লক্ষণীয়, ১৯ এপ্রিল ইরানে যে হামলা চালানো হয়, তাকে ‘দুর্বল’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইসরাইলের অনেক রাজনৈতিক নেতা। শুধু তাই নয়, এর আগে ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নেতানিয়াহু প্রশাসন যে ‘যুদ্ধ মন্ত্রিসভা’ আহ্বান করে, তাকে পাগলামি আখ্যা দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে বিভিন্ন ইসরাইলি মিডিয়া। এসবের পরও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর সাহস করছেন না নেতানিয়াহু। এর কারণ, গাজা যুদ্ধসহ বেশকিছু কারণে প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহু প্রশাসনের সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না!

যাহোক, ইরান-ইসরাইল সংঘাত আপাতত শেষ হয়েছে, বলা যায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, এতটুকুতেই কি এই দুই শক্তি তথা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল শান্ত হয়ে যাবে? অবশ্যই না। বরং বিগত কয়েক মাসের উত্তেজনা নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ও দ্বন্দ্বকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এর কারণ, ইরান ও ইসরাইল উভয়েই একে অন্যকে খতম করে দেওয়ার শপথ নিয়ে রেখেছে। ফলে অচিরেই এ দুই শক্তি আবারো দীর্ঘস্থায়ী ছায়া যুদ্ধে ফিরে আসবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাবে ইরানের প্রক্সিগ্রুপগুলো। যতদিন গাজায় ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে, অন্তত ততক্ষণ পর্যন্ত এই লড়াই চলবে বলে ধরে নেওয়া যায়।

বাস্তবতা হলো—ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেন জুড়ে বিস্তৃত ইরান-ইসরাইল সংঘাত যতই দীর্ঘ হবে, ততই জটিল হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল। এই দ্বন্দ্বের পক্ষগুলো নিজেদের শক্তি জাহির করা শুরু করেছে সবেমাত্র! আগামী দিনগুলোতে বড় ধরনের সংঘাত প্রত্যক্ষ করাও অবান্তর চিন্তা নয়। সেক্ষেত্রে যুদ্ধে জয়লাভের পথকে মসৃণ করতে নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্রে অস্ত্রাগার ভরিয়ে তুলতে চাইবে স্ব স্ব পক্ষ। এটাই যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে! তবে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষকেই যে অনেক কিছু খোয়াতে হতে পারে, তা-ও নিশ্চয় ভালো করেই জানা আছে তাদের। আসলেই, বৃহত্ সংঘাত সব পক্ষেরই বহু কিছু কেড়ে নেবে।

লেখক: সিএনএনের লন্ডন-ভিত্তিক জ্যেষ্ঠ অনুসন্ধানী লেখক

সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন