সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

লোকসভা নির্বাচন ২০২৪

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের ভোটে মেরুকরণের আবহ নেই

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:৫৪

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরের গ্রামে বসে রবিন্দর যখন বলেন, গতবারও বিজেপি-কে ভোট দিয়েছি, এবার দিচ্ছি না। আমার ভোট যাবে বিএসপি-র কাছে, তখন একটু অবাক হয়েছিলাম। তারপর মুজফফরনগরে যত ঘুরেছি, ততই অবাক হওয়ার মাত্রা বেড়েছে বই কমেনি। দলিতদের গ্রামে গিয়ে তফসিলি জাতির ভোটদাতাদের একবাক্যে বলতে শুনেছি, এবার তাদের ভোট পড়ছে বিএসপি-তে। অনগ্রসররা কেউ সমাজবাদী পার্টি বা কেউ বিএসপি-কে ভোট দেয়ার কথা বলছেন। বিজেপি-তেও ভোট যাচ্ছে, তবে মেরুকরণের আবহে যেরকম হইহই করে যায়, সেরকম নয়।

এই মুজফফরনগরেই তো ২০১৩ সালে জাঠ ও মুসলিমদের মধ্যে ভয়ংকর দাঙ্গায় শতাধিক মানুষ মারা গেছিলেন। ঘরছাড়া হয়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। তারপর ২০১৪ সালে যে প্রবল মেরুকরণ হয়েছিল, তার জেরে বিজেপি হইহই করে এই অঞ্চলে জিতেছিল। মুসলিমবহুল এই অঞ্চলে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি বা কংগ্রেস বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারেনি।

২০১৯-এ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পুলওয়ামার ঘটনার পর পাকিস্তানে ঢুকে ভারতীয় সেনার জঙ্গিদের আঘাত করার ঘটনা। তারপর আবার এই অঞ্চলে মেরুকরণ সম্পূর্ণ হয়েছিল। জাঠবলয়ের কেন্দ্রে মুজফফরনগরে হারতে হয়েছিল চরণ সিং-পুত্র অজিত সিং-কেও। যে চরণ সিং ও তার পরিবারকে জাঠরা অন্ধের মতো অনুসরণ করে।

সেই মুজফফরনগরে বসে রবিন্দর, হরপাল, রবিদাসরা যখন বলেন, ভোট পড়ছে জাতপাতের হিসাবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অবাক হওয়ার কথা। যে মেরুকরণের জেরে বিজেপি একের পর এক আসন জিতে যায়, উত্তরপ্রদেশের সেই আখবলয়ে অন্য কথা শোনা যাচ্ছে কেন?

কিছুদিন আগেই রামমন্দিরের উদ্বোধন করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তারপর প্রচুর মানুষ রামমন্দির দেখতে গেছেন, এখনো যাচ্ছেন। মিরাটে বিজেপি তাদের বর্তমান সাংসদকে প্রার্থী না করে টিকিট দিয়েছে টেলিভিশনে অত্যন্ত জনপ্রিয় সিরিয়াল রামায়ণে রামের ভূমিকায় অভিনয় করা অরুণ গোভিলকে। তারপরেও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, গোভিল জিতবেনই। হঠাৎ কী এমন হলো, মেরুকরণের বদলে জাতপাতের অঙ্ক প্রবল হলো পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে?

উত্তরপ্রদেশকে হাতের তালুর মতো চেনেন সাংবাদিক শরদ গুপ্তা। দিল্লি আসার আগে দীর্ঘদিন লখনউতে সাংবাদিকতা করেছেন। ডিডাব্লিউকে শরদ বলেছেন, রামমন্দির তো হয়ে গেছে। অনেকদিন ধরেই মানুষ জানে, রামমন্দির হচ্ছে, এখন তার উদ্বোধন হয়ে গেছে। ফলে তাদের কাছে সেটা আর আবেগের বিষয় থাকছে না।

শরদের মতে, আবেগের বিষয় না থাকায় জাতপাতের অংক আবার প্রবল হয়েছে। আর বিজেপি-র চান্তা বাড়িয়েছে, ভোটের হার কম হওয়া। আবেগের বিষয় থাকলে, মেরুকরণ হলে মানুষ প্রচুর সংখ্যায় ভোট দেন। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না।

মনে পড়ে গেল বারাণসীতে কংগ্রেস প্রার্থী ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাইয়ের কথা। ডিডাব্লিউকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অজয় বলেছেন, ''শ্রীরামের প্রতি আমাদের সকলের আস্থা, বিশ্বাস ও সম্মান আছে। রামমন্দিরে সকলে গিয়ে স্রীরামকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন। তার মানে এই নয় যে, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, জীবনযাপনের দুর্দশার কথা ভুলে তারা ভোট দেবেন। এবার রামমন্দির ভোটের বিষয় হতে পারে না।

রবিদাস বলছিলেন, আমরা তো এবার আমাদের জাতের, সমাজের কথা ভেবে বোট দিচ্ছি। তাই বহুজন সমাজ পার্টির হাতিতে ভোট দিয়েছি।  উত্তরপ্রদেশের এটা আরেকটা বিশেষত্ব। মানুষ সোজাসাপটা বলেন, কাকে ভোট দিয়েছেন।

মুজফফরনগরের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বাকি এলাকার অবস্থা সহজেই অনুমান করতে পারবেন। সর্বত্র উঠে আসছে জাতপাতের অংক। সবাই তাদের সমাজের কথা বলছে, তার গোষ্ঠীগত মান-মর্যাদা, তাদের লাভ, সুবিধা-অসুবিধার কথা বলছে।

ভোটবিশেষজ্ঞ কপিলের মতে, গতবারও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের অনেক কেন্দ্রে চার হাজার, পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তি হয়েছে। মেরুকরণ থাকা সত্ত্বেও। এবার তো সেই মেরুকরণ নেই।

উল্টোদিকের ছবিটাও দেখা যাক। মুজফফরনগরে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী এবার হরেন্দ্র মালিক। তিনি জাঠ। বিপক্ষে বিজেপি-র সঞ্জীব বালিয়ানও জাঠ। একমাত্র বিএসপি-র দারা সিং প্রজাপতি হলেন কুমোর। প্রজাপতিদের ভোট আছে এক লাখের উপরে। মুসলিমপ্রধান গ্রামে গিয়ে সাজিদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কাকে ভোট দিয়েছেন। তিনি ও তার সঙ্গীরা একবাক্যে বলেছেন, তাদের ভোট পড়েছে সমাজবাদী পার্টির সাইকেলে। তার অর্থ ২০১৩ সালের বৈরিতা ভুলে জাঠ প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন মুসলিমরা। ২০১৪-তে তা ভাবাই যেত না। ২০১৯ সালেও প্রায় একই অবস্থা ছিল। সমাজবাদী পার্টি তাই এখানে জাঠ প্রার্থী দিতে পারেনি। এবার দিয়েছে।

সত্যিই মেরুকরণের ছবিটা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সেভাবে চোখে পড়ছে না। শরদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী মোদি, অমিত শাহ, রাজনাথ সিং, জে পি নাড্ডারা দিনে তিনটে করে জনসভা করছেন। প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার পর একই কেন্দ্রে অমিত শাহ, রাজনাথরা যাচ্ছেন। প্রচারের ঝড় তুলছেন। সব ধরনের বিষয় সামনে আনছেন। বিরোধীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন। তাও ভোটের হার তাদের প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না। আবেগের বিষয় থাকলে মানুষ যে উৎসাহ নিয়ে ভোট দেন, তা নেই। তাই ভোটের হার কম হচ্ছে।

সত্যি কথা, মুজফফরনগরের বুথগুলি অধিকাংশই ছিল খালি। অধিকাংশ জায়গায় লাইন ছিল না বা থাকলেও খুব কম। মুসলিমপ্রধান এলাকায় অবশ্য বুথে ভিড় ছিল। বিকেলের দিকে ভোট দেওয়ার হার কিছুটা বাড়ে।

গত ১৯ এপ্রিল প্রথম পর্বের ভোটে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভারতেআবেগের বিষয় থাকলে, মেরুকরণ হলে এত কম ভোট পড়ে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি