বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সামাজিক অস্থিরতা :প্রতিকার কোথায়?

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০

সারা বিশ্বে যখন অস্থিরতা বিদ্যমান, তখন গ্লোবাল ভিলেজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশেও নানারূপ অস্থিরতা থাকিবে, ইহাই কি স্বাভাবিক নহে? বিশেষ করিয়া, কোনো দেশে যখন আইনের শাসনের অভাব দেখা দেয় এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট থাকে, তখন সামাজিক অস্থিরতাও প্রকট হইয়া উঠে। এই অস্থিরতায় পড়িয়া এমন সকল অন্যায়, অনিয়ম ও অপরাধকর্ম সংঘটিত হইতে দেখা যায়, যাহা বিশ্বাস করাও অনেক সময় কঠিন হইয়া পড়ে। আমাদের দেশে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নূতন নহে। কিন্তু ইদানীং ইহাতে এমন সকল মাত্রা যোগ হইয়াছে, যাহা দেখিয়া, শুনিয়া ও জানিয়া বিস্মিত হইতে হয়। মাদকাসক্তি যেইভাবে বাড়িতেছে, তাহার কারণেও এই দেশে বাড়িতেছে পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হইয়াছে যে, রাজধানী ঢাকায় মাদকাসক্ত মামার ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হইয়াছে ভাগিনার। নিহতের বড় ভাই গুরুতর আহত হইয়া চিকিত্সাধীন। তাহারা দুই ভাই নানাবাড়িতে বেড়াইতে যায় এবং মামা নানির নিকট হইতে মাদক সেবনের জন্য টাকা চাহিতে গেলে একপর্যায়ে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির মধ্যে মামা দুই ভাগিনাকে ছুরিকাঘাত করিয়া পালাইয়া যায়।

এই দিকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে মোবাইল ফোনে গান শুনিবার জন্য সন্তানদের গালিগালাজকে কেন্দ্র করিয়া স্বামী-স্ত্রীর কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাঁশের লাঠি দিয়া স্ত্রী ও বাধাদানকারী কন্যাকে হত্যা করেন ঐ স্বামী। পুত্রকেও একইভাবে গুরুতর আহত করেন। মানুষ রাগ ও ক্ষোভের কোন পর্যায়ে পৌঁছাইলে হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া নিজ পরিবারে এমন সর্বনাশা কর্মকাণ্ড ঘটাইতে পারে—তাহা কি ভাবা যায়? অল্পতেই মানুষের এত উত্তেজিত হইবার হেতু কী? মানুষ যেন উত্তেজিত হইবার জন্য মুখাইয়া আছে, কোনো ছুতা বা উপলক্ষ্য পাইলেই হইল! তাহা না হইলে সন্দেহবশত সামান্য চুরি বা অপরাধের দায়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার ঘটনা কেন ঘটিবে? এইভাবে যাহারা আইন নিজের হস্তে তুলিয়া নেয়, তাহারা নৃশংস ও বিবেকহীন। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, সমাজে নানা অস্থিরতার কারণে মানুষের মন-মেজাজের উপর তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে। এই ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা আরো ভালো বলিতে পারিবেন। তবে কোনো সমাজে যখন সত্যিকারের সুখ থাকে না, জীবনসংগ্রাম কঠিন হইয়া উঠে; মাদকাসক্তি, হিংসা-বিদ্বেষ, হতাশা, বঞ্চনা ইত্যাদি মাথা চাড়া দিয়া উঠে, অন্যায় ও অবৈধভাবে অর্থোপার্জনের তেমন কোনো বিচার হয় না, তখন সেই সমাজে অস্থিরতা নিয়তি হইয়া দাঁড়ায়। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই সমস্যা যেইভাবে দিন দিন প্রকট হইয়া উঠিতেছে তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন।

গতকালকের ইত্তেফাকের আরেকটি সংবাদ লক্ষণীয় ও বিশ্লেষণযোগ্য।  ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে বখাটেরা কোপাইয়া হত্যা করিয়াছে এক কিশোরকে। বখাটেপনা ও কিশোর গ্যাং আমাদের দেশের আরেক সমস্যা। আবার পরিবারে যেমন, তেমনি আমাদের সমাজেও ভাঙন দেখা দিয়াছে। আগের মতো মুরুব্বিশাসিত গ্রামবাংলা এখন আর নাই। তাই এইখানেও বিশৃঙ্খলা, অনৈক্য ও অরাজকতা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া একশ্রেণির উঠতি মাস্তান ও কালো টাকার কারবারিদের কারণে আজকাল মফস্্সল বা গ্রামাঞ্চলেও বসবাস করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। সামাজিক অস্থিরতার জন্য এই পরিস্থিতিও দায়ী বহুলাংশে।

মোদ্দা কথা, আইনের শাসন কায়েম করিতে না পারিলে সামাজিক অস্থিরতার অবসান হইবে না। আইনকে যেমন তাহার স্বাভাবিক পথে চলিতে দিতে হইবে, তেমনি বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাও দূর করিতে হইবে। পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হইতে হইবে। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ঘন ঘন উদাহরণ তৈরি না হইলে এইরূপ অপরাধপ্রবণতা হইতে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হইবে না।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন