সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

৩৫ ইনস্টিটিউট বিক্রি করেছে সাড়ে ৫ হাজার জাল সনদ!

১৫ বছর ধরে চলছে এই অবৈধ কার্যক্রম,

বোর্ডের সিস্টেম অ্যানালিস্টরাই চক্রের মূল হোতা,

আদালতে পাঁচ জনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০০

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে অনেক দিন ধরেই। ধীরে ধীরে এটা পচনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুধু বর্তমান চেয়ারম্যানের সময়েই নয়, গত ১৫ বছর ধরে সনদ জালিয়াতি চক্র এখানে গেড়ে বসেছে। সাবেক একজন চেয়ারম্যানও আছেন এই দুর্নীতির সঙ্গে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তারাও বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে সিস্টেম এনালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামানকে ‘সৎ অফিসার’ হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ৩৫টি ইনস্টিটিউট সাড়ে ৫ হাজারের বেশি সার্টিফিকেট বিক্রি করেছে। ডিবি বলছে, এদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করা হবে। আনা হবে আইনের আওতায়।

ডিবির উপ-কমিশনার মশিউর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করতে ষড়যন্ত্র করেছে। এর সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা আছে, তারা যে পেশারই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা বিভিন্ন পেশার ৩০ জনকে নজরদারির মধ্যে রেখেছি, তাদেরও যে কোনো সময় আইনের আওতায় আনা হবে। এ পর্যন্ত ছয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে সিস্টেম এনালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামান, চাকরিচ্যুত কম্পিউটার অপারেটর ফয়সাল আহমেদ, কুষ্টিয়ার গড়াই সার্ভে ইনস্টিটিউটের পরিচালক সানজিদা কলি, কামরাঙ্গীরচরের হিলফুল ফুযল কারিগরি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সরদার মো. গোলাম মোস্তাফা ও যাত্রাবাড়ীর ঢাকা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালক মাকসুদুর রহমান মামুন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া সদ্য বিদায়ি চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের স্ত্রী সেহেলা পারভীনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

ডিবিতে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ :গতকাল মঙ্গলবার ডিবি কার্যালয়ে ডেকে সদ্য বিদায়ি চেয়ারম্যান আলী আকবর খান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কেফায়েত উল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, এই ঘটনার দায় তারা অস্বীকার করতে পারেন না। এই ধরনের দুর্নীতির বিষয়টি তারা আগেই জানতেন। যে কারণে কিছুদিন আগে শামসুল আলমকে সিস্টেম এনালিস্টের পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে কম্পিউটার অপারেটর করে সেখানে এ কে এম শামসুজ্জামানকে সিস্টেম এনালিস্ট পদে বসানো হয়। তিনিও এই পদে এসে যে একই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন সেটা তারা জানতেন না। তারা স্বীকার করেন, আগে থেকে যদি তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এতদূর আসত না। আলী আকবর খানের দাবি, তার স্ত্রী যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন সেটা তিনি কোনোভাবেই জানতেন না। ডিবি তাদের ঢাকা শহর ছাড়তে নিষেধ করেছে। প্রয়োজনে তাদের আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে ডিবি।’

কারা পেয়েছে এই টাকার ভাগ: ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সিস্টেম এনালিস্ট এ কে এম শামসুজ্জামান স্বীকার করেছেন, কাকে তিনি কত টাকা দিয়েছেন। কীভাবে দিয়েছেন, কখন দিয়েছেন তার সব প্রমাণপত্র তিনি ডিবিকে দিয়েছেন। ডিবি কিছু ভিডিও ফুটেজও সংগ্রহ করেছে। যেখানে কিছু লেনদেনের দৃশ্য ধারণ করা আছে। ডিবি বলছে, এরাও এই মামলার আসামি হবে। দুদকে এই ঘটনায় দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। সেই মামলাটি তদন্তের জন্য একজন সৎ অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। শামসুজ্জামান গ্রুপ ঐ অফিসারকে সরাতে ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছে। সেই টাকা আবার ডলারে পরিশোধ হয়েছে। পরে ঐ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দুদকে কেরানি থেকে উপ-পরিচালক হওয়া একজন অসৎ কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কর্মকর্তা দফায় দফায় টাকা নিয়েছেন। পরে মাসোহারা চুক্তিতে তিনি টাকা পেতেন। সেই কর্মকর্তারা এখনো আছেন বহাল তবিয়তে। 

কারা নিত, কত টাকায় নিত এই সনদ :রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে এমপিওভুক্ত ও নন এমপিওভুক্ত কারিগরি কলেজ ও ইনস্টিটিউট আছে। আইন অনুযায়ী এখানে এমপিও ধরে রাখতে পাশের নির্ধারিত কোটা আছে। আবার নন এমপিওদের এমপিওভুক্তি পেতেও পাশের কোটা আছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কোটা অনুযায়ী পাশ করত না, তারাই এখানে পাশের কোটা বাড়াতে অসততার আশ্রয় নিতেন। আবার অনেকে কারিগরি বোর্ডের কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তিই হয়নি তারাও টাকার বিনিময়ে নিত সনদ। ফলে নানাভাবে এখানে দুর্নীতি হয়েছে দিনের পর দিন। ডিবি শামসুজ্জামানের তিনটি ফোন জব্দ করেছে। সেখানে কাকে কত টাকা দিয়েছে, কীভাবে দিয়েছে, তার অনেক প্রমাণপত্র আছে। আছে কিছু ভিডিও চিত্রও।

যেভাবে এই চক্রে জড়িয়ে পড়েন সেহেলা পারভীন: কুষ্টিয়ার গড়াই সার্ভে ইনস্টিটিউটের পরিচালক সানজিদা কলি দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তিনি বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। সানজিদা কলি জানিয়েছেন, আলী আকবর খান চেয়ারম্যান হলেও তার খুব বেশি সচ্ছলতা ছিল না। ফলে তার স্ত্রীর শখ-শৌখিনতা খুব বেশি পূরণ হয়নি। আর এটাকেই সুযোগ হিসেবে নেন তিনি। বাসায় গিয়ে সেহেলা পারভীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। নানা ধরনের উপহার নিতে যেতেন। সম্পর্কের একপর্যায়ে অবৈধ অর্থের প্রলোভন দেখান। তাতেই সায় দেন সেহেলা। পাঁচ-ছয় মাস ধরে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। 

কারাগারে সেহেলা পারভীন: সনদ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের স্ত্রী মোছা. সেহেলা পারভীনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতাউল্লাহর আদালত এই আদেশ দেন। গতকাল সেহেলা পারভীনকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক মো. আমিরুল ইসলাম তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতাউল্লাহর আদালত এ আদেশ দেন।   

ইত্তেফাক/এমএএম