ভূরাজনীতির উত্তেজনায় কাঁপিতেছে সমগ্র বিশ্ব! ঈদুল ফিতরের পর ইসরাইলে ইরানের উপর্যুপরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অনেকে সরাসরি তৃতীয় বিশ্বের সূত্রপাত হইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আপাতত সেই শঙ্কা না থাকিলেও উত্তেজনা কমিয়া যাইবারও কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাসী দুই বত্সরেরও অধিককাল ধরিয়া এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তাহার পর শুরু হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শেষ না হইলেও নূতন করিয়া মধ্যপ্রাচ্যে গাজা যুদ্ধ বিশ্ববাসীকে করিয়া তুলিয়াছে আতঙ্কিত। মহামারি ও যুদ্ধ—উভয় ক্ষেত্রেই সবচাইতে মূল্য দিতে হইয়াছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। বিশ্ব অর্থনীতিতে সেই দুষ্টচক্রের এখনো অবসান হয় নাই। এই উভয় উত্তেজনায় গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। লোহিতসাগরে ইয়ামেনের হুতিদের আক্রমণে এখনো হুমকির মুখে বিশ্ববাণিজ্য। যুদ্ধের জেরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও পালটা নিষেধাজ্ঞায় সার্বিকভাবে বিশ্ব জুড়িয়া বাড়িয়া গিয়াছে মূল্যস্ফীতি।
এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত। সম্মুখের দিনগুলি লইয়া এখনো শঙ্কা কাটিয়া যায় নাই। তবে ইহারই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধিশালী দেশ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বাংলাদেশ সফর করিয়া গেলেন। কাতার এমন একটি দেশ, যাহারা বিশ্ববাণিজ্য, ক্রীড়া প্রভৃতিতে সফলতার পাশাপাশি কূটনীতির ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করিয়া চলিয়াছে। এমন একটি দেশের শীর্ষনেতার বাংলাদেশ সফরে আমরা আশাবাদী। কাতারের আমির যেই সকল চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করিয়াছেন, তাহা দেখিয়াও আমরা আশা করিতে পারি যে, বাংলাদেশ আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইবে। করোনার পূর্বে আমাদের সার্বিক অবস্থা ছিল আশাব্যঞ্জক। করোনা ও যুদ্ধবিগ্রহের অভিঘাত আমাদের স্পর্শ না করিলে আমরা আজ বহুদূর অগ্রসর হইতে পারিতাম নিঃসন্দেহে। এখন আমাদের সকল প্রকার স্থিতিশীলতা রক্ষা করিয়া চলিতে হইবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থার কারণে আমাদের অর্থনীতিতে যেই ক্ষত সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা হইতে বাহির হইয়া আসিবার জন্য আরো সময় প্রয়োজন। তদুপরি, এই অবস্থার মধ্যেও বিশ্বের অর্ধশত দেশে এই বত্সর অনুষ্ঠিত হইতেছে সাধারণ নির্বাচন। সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের কারণেও দেশে দেশে বৃদ্ধি পায় অস্থিরতা। এই জন্য অর্থনৈতিক উদ্বেগ এই বত্সরে আর কাটিবে বলিয়া মনে হয় না। নির্বাচনে যাহারা জিতিবেন তাহারা ভর্তুকি, করসুবিধা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা, বাণিজ্য বাধা, বিনিয়োগ, ঋণ মওকুফ ও জ্বালানি রূপান্তর ইত্যাদি বিষয়ে নিজ নিজ দেশের নূতন নীতি নির্ধারণ করিতে পারেন। বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি এই সকল নীতির উপর নির্ভরশীল বহুলাংশে। উন্নত দেশগুলি যদি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনে আরো অধিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের পথে হাঁটে, তাহা হইলে অনুন্নত ও উন্নয়নকামী দেশগুলি পড়িবে বিপাকে। বিশ্ববাণিজ্য কমিয়া গেলে বিভিন্ন দেশের মানুষের আয়ও কমিয়া যাইবে। ইহাতে দুর্বল হইবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ১৯৩০ দশকের ন্যায় সমগ্র বিশ্বে অস্থিরতা বিদ্যমান। তাহার উপর জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক জোটের নানা সমীকরণে বাড়িতেছে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা।
এই সকল উত্তেজনা ও উদ্বেগের মধ্যেই ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ সংকট কাটাইয়া উঠিবার চেষ্টা করিতেছে। ইহাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হইবারই কথা। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হইয়াছে যে, চলতি অর্থবত্সরে (২০২৩-২০২৪) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নামিয়া আসিতে পারে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে। আমরা বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস করিতে কতটা সফল হইব, তাহাও এখন দেখিবার বিষয়। ভূরাজনীতি ভূ-অর্থনীতিকে যেইভাবে প্রভাবিত করিতেছে তাহা চিন্তার বিষয় বটে। সরকারি-বেসরকারি খাতের জন্যও ইহা উদ্বেগজনক। ইহারই মধ্যে কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অনিয়ম হ্রাস, সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইত্যাদি উদ্যোগের মাধ্যমে জনসমাজে যথাসম্ভব শান্তি, স্বস্তি ও আশাবাদের বাণী ছড়াইয়া দিতে হইবে। কেননা হতাশা নহে, মানুষ বাঁচে আশায়। এই জন্য কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত লিখিয়াছেন : আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়,/ তাই ভাবি মনে?/ জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,/ ফিরাব কেমনে?/ দিন দিন আয়ুহীন হীনবল দিন দিন,—/ তবু এ আশার নেশা ছুটিল না? এ কি দায়!’‑
