উন্নয়নশীল দেশগুলি অশাসনযোগ্য হইয়া উঠিতেছে কেন

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৫

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি বরাবরই বিশৃঙ্খল। তাহার কারণও নিশ্চয়ই রহিয়াছে। এই সকল দেশে রহিয়াছে আইনের শাসনের ঘাটতি। জোর যাহার মুল্লুক তাহার—এই নীতি আজও বিদ্যমান। নাগরিক অধিকার রক্ষার ব্যাপারে এই সকল দেশ উদাসীন ও অযত্নশীল। জাতীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি ভঙ্গুর। ফলে এই সকল দেশ যাহারা পরিচালনা করেন, তাহাদের অনেক কাঠখড় পোড়াইতে হয়। তাহারা সমস্যার আসল জায়গায় হাত দিতে পারেন না বা দেন না। ইহাতে এই সকল দেশ ম্যানেজ করা সকল সময় সহজ হয় না। অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলিয়া যায় যে, ম্যানেজ করিবার মতো পরিবেশই আর থাকে না। তখন চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে একসময় সহজ সমাধান হিসাবে দেখা দিত মার্শাল ল’। ইহাতে সংবিধান স্থগিত হইয়া যাইত। পরিস্থিতির উন্নতি হইলে আবার ফিরিয়া আসিত বেসামরিক সরকার; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি ম্যানেজ করিবার এই অস্ত্রে এখন আর ধার নাই বলিলেই চলে। আজকাল মার্শাল ল দেখা যায় কদাচিৎ। তবে এখন অনেক উন্নয়নশীল দেশে ইহার নবসংস্করণ হইতেছে পুলিশি শাসন। এই সকল দেশকে পুলিশি রাষ্ট্র বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম অনেক দিক দিয়াই তাহারা আজ স্বয়ংসম্পন্ন ও অধিকতর শক্তিশালী। তাই পুলিশ দিয়া যেইখানে শৃঙ্খলা আনা যায়, সেইখানে সেনাবাহিনীর কী দরকার? তাহারা কি নিজ দেশে যুদ্ধ করিবেন?

অনেক উন্নয়নশীল দেশ আজ অর্থনৈতিক দিক হইতে উন্নত হইয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্র বা সূচকের কথা বিবেচনা করিলে তাহাদের উন্নত দেশের সহিতও তুলনা করা যাইতে পারে; কিন্তু উন্নত দেশের মতো উন্নয়ন হইলেও রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাহাদের পূর্বের মতোই পশ্চাত্পদতা রহিয়া গিয়াছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহার অবনতি হইয়াছে। ইহাতে দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে, সেইখানে শুধু পুলিশি শাসন বজায় আর মামলা-মোকদ্দমা দিয়া সকল কিছু সামলানো যাইবে কি না, সন্দেহ। সেই সকল দেশে বিরোধী দলের স্পেস দিনদিন সংকুচিত হইয়া আসিতেছে। এমনকি কোনো কোনো দেশে বিরোধী দলের অস্তিত্বই খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হইয়াছে মাস্তান ও গুন্ডাবাহিনী। তাহারাই তৃণমূল পর্যন্ত দাপাইয়া বেড়াইতেছে। তাহারা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করিয়া সাধারণ নাগরিকদের উপর চালাইতেছে স্টিমরোলার। বড় সমস্যা হইল, যাহারা সরকারি দলে অনুপ্রবেশকারী এবং উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিয়াছে তাহাদের দৌরাত্ম্য আরো অধিক। তাহাদের অনেকে রাতারাতি সরকারি দলের সমর্থক বনিয়া গিয়াছে। তাহারা যে সেই দলের আসল লোক নহে, তাহা অনেকেরই অজানা নহে।  প্রকৃতপক্ষে তাহারা বর্ণচোরা, সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী। দল বিপদে পড়িলে যে কোনো সময় তাহারা কাটিয়া পড়িতে কার্পণ্য করিবে না। তাহাদের কেহ কেহ দেশের স্বাধীনতাবিরোধীও। দেশ ও দলের প্রতি তাহাদের কোনো মায়া নাই। তাহারা নিজেদের স্বার্থকেই সর্বদা বড় করিয়া দেখে; কিন্তু তাহারাই যখন সরকারি ও অন্যান্য দলের অভ্যন্তরে ঢুকিয়া পড়িয়া গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি বাগাইয়া লয় এবং ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলিয়া যায়, তখন তাহাদের দ্বারা যে কোনো অন্যায় ও অনিয়ম করা  মোটেও অসম্ভব নহে। তাহাদের অত্যাচার-নির্যাতনে এখন স্থানীয় এলাকায় বসবাস করা শান্তিপূর্ণ ও নিরীহ মানুষের পক্ষে কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।

এখন প্রশ্ন হইল, উন্নয়নশীল দেশে এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি হইল কেন? এমন তো নহে যে, এই দুঃসহ পরিস্থিতি এক দিনেই সৃষ্টি হইয়াছে। তাহাদের ব্যাপারে সজাগ থাকিবার কথা সচেতন মহল বলিলেও কে শুনে কাহার কথা? এই জন্য দেখা যায়, এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কোথাও না কোথাও অস্থিরতা লাগিয়াই আছে। তাহাদের ব্যাপারে শাসকদের বোধোদয় না হইলে তাহার পরিণতি কখনোই শুভ হইবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন