ক্যালেন্ডারের পাতা বলিতেছে, সময় এখন প্রখর গ্রীষ্মকাল। তপ্ত দুপুরে পিচঢালা রাস্তায় যেন মরুভূমির মতো মরীচিকার ঢেউ উঠে। কংক্রিটের জঙ্গল যেন রাজধানী ঢাকাকে পরিণত করিয়াছে অগ্নিদ্বীপে। এই দারুণ দহনবেলায় সকলের মুখে কেবল গরমের গরম খবর। যেন পৃথিবীতে একটিই ঋতু! গরম আর গরম!
গরমকালে গরম কি অতীতে এইভাবে দহনজ্বালায় জ্বালাইত না? গ্রীষ্মকালে প্রবল উষ্ণতায় চারিদিকে ঝাঁঝাঁ করিবে—ইহাই তো স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই আগের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালের দহন কিছুটা বাড়িয়াছে; কিন্তু অনেকেই মনে করেন, যতখানি বাড়িয়াছে, তাহার চাইতে অধিক কমিয়াছে মানুষের সহিষ্ণুতা। মানুষ এখন অল্পতেই অস্থির হইয়া পড়ে। প্রকৃতির তপ্তদশা যেন আমাদের মস্তিষ্কেও হানা দিতেছে। গরমে যা যা নিয়ম অতীতের বত্সরগুলিতে মানিয়া চলিতে হইয়াছে, এখনো তাহাই মানিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি মনে রাখিতে হইবে, এই সময়ে তপ্ত অনুকূল পরিবেশে কিছু ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার দাপট বাড়িয়া যায়। তাহারা চেষ্টা করে শরীরের প্রতিরোধব্যূহ ভাঙিয়া তাণ্ডব চালাইতে। স্বাভাবিকভাবেই এই সময় অনেকেরই শরীর ম্যাজম্যাজ করে কিংবা অব্যাখ্যেয় বিষাদ ও আলস্য জাঁকিয়া বসে শরীর-মন জুড়িয়া। বিজ্ঞানীরা ইহাকে বলিয়া থাকেন ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার।’ আমেরিকার সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই সময় সাময়িক কয়েক দিনের জন্য মস্তিষ্কের মধ্যে রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতারও সৃষ্টি হয়। যাহার ফলে মানুষ বিষণ্নতা ও নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হইয়া থাকে।
পরিবর্তনই জগতের নিয়ম। যদিও কোনো কোনো পরিবর্তন চক্রাকারে ফিরিয়া ফিরিয়া আসে, কোনো কোনো পরিবর্তন চক্রাকারে হয় না। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ দীর্ঘ কয়েক শতক ধরিয়া যাহা করিতেছে, তাহাদের যেই পরিবর্তন ঘটিতেছে, তাহা খুব শিগিগরই চক্রাকারে ফিরিবে না। পৃথিবীতে ঘুরিয়াফিরিয়া বরফযুগ আসিয়াছে, পুনরায় পৃথিবী উষ্ণ হইয়াছে; কিন্তু এই ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়াছে অত্যন্ত ধীরলয়ে, হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ বত্সরের ব্যবধানে। তবে বিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, এখন যেই পরিবর্তন ঘটিতেছে, তাহা অকস্মাত্ এবং অতি দ্রুত। এই জন্য ইহা স্বাভাবিক নহে। আমার বায়ু বিষাইয়া যাইতেছে, আমাদের আলো ঘোলাটে হইয়া যাইতেছে, আমাদের শরীর প্রতিকূল পরিবেশের সহিত যুঝিতে না পারিয়া অস্বস্তি বোধ করিতেছে।
প্রকৃতির দহনকালের মতো এই সময় পৃথিবী জুড়িয়াই চলিতেছে রাষ্ট্র-সমাজ তথা মানবসভ্যতার দহনকাল। ‘সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’-এর মতো একধরনের ডিসঅর্ডার চারিদিকে দৃশ্যমান। স্থিতিশীলতা নষ্ট হইতেছে, বিষাইয়া উঠিতেছে শান্তির সম্ভাব্য পরিবেশ। এই অবস্থায় কী করিব আমরা? যাহারা এইরূপ অবস্থার জন্য দায়ী, তাহারা কীভাবে মূল্যায়িত হইবে ইতিহাসের পাতায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন বলিয়াছেন—‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’ আমরাও কি পারিব এই বিষাক্ত অবস্থা সৃষ্টিকারীদের ক্ষমা করিতে? নাকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই পুনরায় বলিব—‘ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,/ হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা।’ ইহার যুক্তি হিসাবে বলা হইতেছে—‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’ অর্থাত্, অন্যায়কারী এবং অন্যায় সহ্যকারী সমভাবে অপরাধী।
যেইহেতু রাষ্ট্র-সমাজের পরিবর্তন ঘটিতেছে, হাইপারনেশন হইতে জাগিয়া উঠিতেছে বিবিধ জীবাণু, এই গরমে মাথা ঠান্ডা রাখা প্রয়োজন। তাহার জন্য প্রয়োজন শরীর ঠান্ডা রাখা। প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবারেরও। শরীর-মন আমাদের নানান ধরনের সিগন্যাল দেয়। নজর দিতে হইবে সেই সিগন্যালের দিকেও। একইভাবে, এই বিশ্বের বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ঘনঘটাও নানান ধরনের সিগন্যাল দিতেছে। যাহারা সমাজ-রাষ্ট্র পরিচলানার দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহাদেরও নজর দিতে হইবে সেই সব সিগন্যালের দিকে।
