গণতন্ত্র কেবল উদযাপনের নহে, চর্চার বিষয়

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:২৫

দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘ফ্রিডম ডে’ ৩০ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছে। ১৯৯৪ সালে ২৭ এপ্রিল দেশটির কালো মানুষেরা ভোটাধিকার অর্জন করে। এই উপলক্ষ্যে আমরা উহার জাঁকজমকপূর্ণ উদ্যাপন দেখিতে পাইতেছি। ‘ফ্রিডম ডে’ তথা গণতন্ত্রের তিন দশক পূর্তির উদ্যাপন ঘটিতেছে, কিন্তু যেই স্বপ্ন দেখিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা তাহার দেশের জন্য আত্মোত্সর্গ করিয়াছিলেন সেই স্বপ্ন কতখানি পূরণ হইয়াছে আর কতখানি ফিকা হইয়াছে—তাহা এখন সকলেই কমবেশি অনুধাবন করিতে পারেন। ১৯৯৪ সালে যখন নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তিনি ডেসমন্ড টুটুকে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ স্থাপনের দায়িত্ব দেন। বর্ণবাদী শাসনের সময় শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ—এই উভয় সম্প্রদায় পরস্পরের বিরুদ্ধে যেই সকল অপরাধ করিয়াছিল, সেইগুলি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল এই কমিশনকে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটু, যিনি দেশটিতে বর্ণবাদী শাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়ছিলেন, তিনি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুর পূর্বে দুঃখ করিয়া বলিয়া গিয়াছিলেন—যেইভাবে তাহারা স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় সকল কিছু সেইভাবে ঘটে নাই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ ডি ক্লার্ক যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৯০ সালে তিনি ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের ঘোষণাও দেন। কী বিস্ময়কর ব্যাপার! ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন শ্বেতাঙ্গ ডি ক্লার্ককেই তিনি তাহার ডেপুটি প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করেন। সুতরাং ম্যান্ডেলার ভাবনা শুধু কালো মানুষের মুক্তি নহে, তিনি চাহিয়াছিলেন মানুষেরই মুক্তি। তাহার ভাবার্থ হইল—কালো মুক্তির অর্থ সাদারও মুক্তি—অর্থাত্ তাহা মানবতারই মুক্তি, যেই মুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে দেড় শত বত্সর পূর্বে আনিয়াছিলেন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, তাহার দেশ হইতে ক্রীতদাস প্রথার বিলোপসাধন করিয়া নেলসন ম্যান্ডেলা তাহার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে আমাদের জানাইয়াছেন তাহার ২৭ বত্সরের জেলবন্দি জীবনের সেই পরম সহিষ্ণুতার সংগ্রামমুখর দিনগুলির কথা। রোবেন দ্বীপের নির্বাসিত জীবনে মানুষদের মুক্তির জন্য তিনি শক্তি লইয়াছিলেন প্রকৃতি হইতে। সশ্রম কারাদণ্ডের অংশ হিসেবে একটি চুনাপাথরের খনিতে শ্রমিক হিসাবে কাজ করিবার সময়ও ম্যান্ডেলা কারা-অন্তরিনে বর্ণবৈষম্যের শিকার হইয়াছিলেন রাষ্ট্রের নিয়মেই। সামান্য খাদ্য এবং সব চাইতে কম সুবিধাপ্রাপ্ত রাজবন্দি হিসেবে তিনি জানিতেন না, কত বত্সর পার হইলে উষার আলো প্রবেশ করিবে তাহার কারাকুঠুরিতে। যেইভাবেই হউক, একসময় এই নিরন্তর অহিংস সংগ্রাম ও অতিসংযমী ধৈর্যের ফসল ভরিয়া উঠে ম্যান্ডেলার আঙিনায়। তিনি হইয়া উঠেন বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও  ধৈর্যের প্রতীক।  ম্যান্ডেলা মনে করিতেন, ‘এই পৃথিবীকে যেই রকম দেখিতেছি, তোমাকে তাহাই মানিয়া লইতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। আমাদের কাজ হইবে, আমরা যেইরূপ (মানবিক) পৃথিবী চাহি, তাহা খুঁজিয়া লওয়া।’

কিন্তু এখন কেমন রহিয়াছে দক্ষিণ আফ্রিকার গণতন্ত্র? ছোট্ট কথায় তাহার আভাস দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু মৃত্যুর পূর্বে বলিয়া গিয়াছিলেন। আমরাও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন খবরাখবরে তাহার আভাস পাই। গণতন্ত্র তো কেবল উদ্যাপনের নহে, তাহা চর্চার বিষয়। কেবল দক্ষিণ আফ্রিকাই নহে। গত বত্সর গণতন্ত্রের দুঃসময় পার করিয়াছে আফ্রিকা মহাদেশ। সেইখানে বত্সর জুড়িয়াই একের পর এক অভ্যুত্থানে দুমড়ে-মুচড়ে গিয়াছে কথিত গণতন্ত্র। গত বত্সরের ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় ছিল বুট-বুলেটের গর্জন। রাজনৈতিক ঝড়ে আফ্রিকার মধ্য ও সাব-সাহারা অঞ্চলে পরপর পাঁচ দেশে অভ্যুত্থান ঘটে—নাইজার, সিয়েরা লিয়ন, গ্যাবন, বুরকিনা ফাসো ও গিনি বিসাও। ভয়াবহ রূপ নেয় সুদানের গৃহযুদ্ধও। হত্যা, গুম, ধর্ষণসহ অসংখ্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আঁতুড়ঘর হইয়া উঠে মহাদেশের এই দারিদ্র্র্যপীড়িত দেশগুলো। গণতন্ত্রের চারাগাছ অনেক দেশের আবহাওয়া ও মাটিতে ঠিকমতো খাপ খাইতে পারে না। কেবল আফ্রিকা নহে, তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই এই সমস্যা দেখা যায়।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন