এসএসআরএসের (এসকিউএল সার্ভার রিপোর্টিং সার্ভিসেস বা সংক্ষেপে এসএসআরএস হচ্ছে মাইক্রোসফটের সার্ভার-ভিত্তিক রিপোর্ট তৈরিকারী সফটওয়্যার সিস্টেম) সহযোগিতায় ১৮ থেকে ২৩ এপ্রিল অনলাইনে ও টেলিফোনের মাধ্যমে আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে সিএনএন এক জরিপ চালিয়েছে। জরিপে অংশ নেন ১ হাজার ২১২ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক। জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে কিছুটা পেছনে পড়ে গেছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। জরিপের বিভিন্ন দিক নিয়েই মূলত এই লেখা।
জরিপে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউজে নতুন মেয়াদে ফেরার ক্ষেত্রে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প। বেশির ভাগ আমেরিকান মনে করেন, শাসনামলের তুলনা করলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কাল সফল ছিল। অন্যদিকে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, বাইডেন প্রশাসনকে এখন পর্যন্ত ব্যর্থই বলতে হয়।
জরিপে নিবন্ধিত মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের তেমন একটা হেরফের হয়নি। দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—৪৯ শতাংশ। তবে এক্ষেত্রে ২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটারের সমর্থন হারিয়েছেন বাইডেন। এই জরিপে বাইডেনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোটার। এ বছরের শুরুতে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ।
একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ আমেরিকান এখন বলছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে তারা সফল বলে মনে করেন। এর বিপরীতে ৪৪ শতাংশ আমেরিকানের মন্তব্য, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ‘ব্যর্থ’।
আরো একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ২০২১ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। তখনো হোয়াইট হাউজে ছিলেন ট্রাম্প। এরপর ঘটে ৬ জানুয়ারি ইউএস ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা। ঐ সময় চালানো এক জরিপে দেখা যায়, ৫৫ শতাংশ আমেরিকানের মত ছিল, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ‘ব্যর্থ’।
বর্তমানে ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন ‘ব্যর্থ’। ৩৯ শতাংশের মত, তিনি সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বাইডেনের ক্ষেত্রে পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৫৭ শতাংশ আমেরিকান বাইডেন প্রশাসনকে ব্যর্থ হিসেবে মনে করত। ঐ সময় ৪১ শতাংশের মত ছিল, বাইডেন ‘সফল’।
বাইডেন বনাম ট্রাম্প জরিপের এই ফলাফল রিপাবলিকানদের জন্য ভালো খবর স্বাভাবিকভাবেই। এখন তারা এই জরিপের ফলাফল সামনে রেখে আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন বলেই ধরে নিতে হবে। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় মার্কিন ভোটারদের তারা বোঝাতে চাইবেন—ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকানরাই এগিয়ে, তথা বাইডেনের চেয়ে ট্রাম্পই সফল প্রেসিডেন্ট।
জরিপে আরেকটা তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। উভয় দল তাদের পছন্দের প্রার্থীর ওপর কতটা আস্থা রাখছে, তার একটা ধারণা পাওয়া গেছে। জরিপে উঠে এসেছে, ৯২ শতাংশ রিপাবলিকান ট্রাম্পের শাসনামলকে সফল বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, মাত্র ৭৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট বলেছেন, বাইডেন এখন পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বতন্ত্র ভোটাররা (যারা রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট কাউকেই সমর্থন করেন না) দুই প্রেসিডেন্টকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, তা-ও জানা গেছে জরিপে। দেখা যাচ্ছে, স্বতন্ত্রদের মধ্যে ৫১ শতাংশ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প সফল ছিলেন। এর বিপরীতে মাত্র ৩৭ শতাংশ বাইডেনকে ‘সফল’ বলছেন।
দুই প্রেসিডেন্টের কাউকেই চান না কত শতাংশ আমেরিকান, সেই চিত্রও উঠে এসেছে জরিপের ফলাফলে। ১৪ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, দুই প্রেসিডেন্টকেই ‘ব্যর্থ’ বলে মনে করেন তারা। ৮ শতাংশের অভিমত, উভয়েই ‘সফল’।
উল্লেখ করা দরকার, জরিপের ফলাফলে সচরাচর এগিয়ে থাকতে দেখা যায় সাবেক প্রেসিডেন্টকেই। সাবেক প্রশাসকের প্রতিই সাধারণত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। যদিও আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে নির্বাচনে পরাজয়ের পর আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসার চেষ্টা করতে দেখা যায়নি কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টকে।
যাহোক, প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনগুলো, তা উঠে এসেছে জরিপে। জরিপে ৬০ শতাংশ আমেরিকান বাইডেনের নীতিমালা ও কার্যক্রমে ‘ডিসাপ্রুভাল’ (অসম্মতি) জানিয়েছেন। বাকি ৪০ শতাংশ মনে করেন, তিনি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন।
শাসনকালে বাইডেন প্রশাসনের সমালোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা নীতিমালা এবং শিক্ষার্থীদের ঋণের ব্যবস্থাপনার মতো ইস্যু। এ দুই ইস্যুতে বাইডেনের নীতি যথাক্রমে ৪৫ ও ৪৪ শতাংশ মানুষের সমর্থন পেয়েছে।
ওপরের বিষয়গুলো ছাপিয়ে বাইডেনের প্রতি আমেরিকানদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণ হয়ে উঠেছে আর্থিক ইস্যু। ৩৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, বাইডেনের জমানায় মার্কিন অর্থনীতি ‘ভালো’ আছে। একইভাবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাইডেন প্রশাসন কতটা সফল—এমন প্রশ্নে মাত্র ২৯ শতাংশ সম্মতি জানিয়েছেন বাইডেনের নীতিমালার ওপর। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাইডেনের প্রতি আমেরিকানদের এহেন আস্থাহীনতা অবাক করার মতোই!
একটা ব্যাপার লক্ষ করার মতো, এই নির্বাচনে ভোটাররা অর্থনীতিকে বড় ইস্যু হিসেবে দেখতে চাইছেন। নিবন্ধিত ভোটারদের ৬৫ শতাংশ অর্থনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। ২০২০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। তারও আগে ২০১৬ সালে ৪৬ শতাংশ ভোটারের কাছে ‘অর্থনীতি’ গুরুত্ব পেয়েছিল।
জরিপে ৭০ শতাংশ আমেরিকান দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। এই দলে অবশ্য বেশির ভাগই রিপাবলিকান সমর্থক। তাদের বক্তব্য, অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থা পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনই বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে। এমন চিন্তা করা প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জন (৪১ শতাংশ) মনে করছেন, ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলে মুদ্রাস্ফীতির হার কমে আসার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে, যাতে করে অর্থনীতির পরিবর্তন সহজ হয়ে উঠবে।
প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জন রিপাবলিকান (৬১ শতাংশ) বলছেন, অর্থনীতি খারাপ অবস্থায় নিপতিত। এই অবস্থায় নেতৃত্বের পরিবর্তন জরুরি। এতে করে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে, যা অর্থনৈতিক উত্তরণে সহায়তা করবে।
অর্থনীতির পাশাপাশি গণতন্ত্রকেও অন্যতম ইস্যু হিসেবে দেখছেন মার্কিন ভোটাররা। জরিপে দেখা যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে ৫৮ শতাংশ ভোটার গণতন্ত্র রক্ষাকে ‘একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’ বলে অভিহিত করেছেন।
যাহোক, এই বছরের নভেম্বরে যে মার্কিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাতে নিবন্ধিত ভোটারদের বড় একটা সংখ্যা বাইডেন ও ট্রাম্প উভয়ের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন বলে জানিয়েছেন। নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে এই সংখ্যা ১৭ শতাংশ। এই ভোটাররা অন্য কাউকে তথা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবেন বলে ধরে নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ট্রাম্প ও বাইডেন ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র ও কর্নেল ওয়েস্ট এবং গ্রিন পার্টির প্রার্থী জিল স্টেইনের ব্যাপারেও জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৪২ শতাংশ, বাইডেনের প্রতি ৩৩ শতাংশ, কেনেডির প্রতি ১৬ শতাংশ, ওয়েস্টের প্রতি ৪ শতাংশ এবং স্টেইনের প্রতি ৩ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানানোর কথা বলেছেন।
মূল লড়াই যেহেতু হবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে, তাই এ দুই প্রার্থীর দিকেই সবার দৃষ্টি রয়েছে। জরিপে বিভিন্ন ইস্যুর বিচারে বাইডেন বেশ পিছিয়ে পড়লেও একটা জায়গায় ট্রাম্প পেছনে পড়ে গেছেন বেশ খানিকটা। ৩৫ বছরের কম বয়সি ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ৫১ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে গেছে।
ওপরের আলোচনায় স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্র্যাট দলের নেতা জো বাইডেনের চেয়ে এগিয়ে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফৌজদারি অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পরও সমর্থন ধরে রেখেছেন তিনি। নির্বাচনি প্রচারাভিযানে বাইডেনের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে অবশ্য মূল কারণ হিসেবে বাইডেন প্রশাসনের ‘ভুল গাজা নীতি’ গ্রহণ দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও আসল কথা হলো, নির্বাচনে চূড়ান্ত ফলাফলে কে জিতবেন, আর কে হারবেন, তা আগে থেকে বলা কঠিন, বিশেষ করে তা যদি হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
লেখক: সিএনএন পোলিং ডিরেক্টর
সিএনএন থেকে অনুবাদ :সুমৃত্ খান সুজন
