ভালো কথা শুনিতে বা পড়িতে কাহার না ভালো লাগে! সেই যে আমরা ছোটবেলায় মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘আমার পণ’ কবিতায় পড়িয়াছি—‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,/ সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ এই কবিতার এক জায়গায় বলা হইয়াছে—‘সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে,/ মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে।’ কী ভালো কথা! শুনিলে মন-প্রাণ-কান জুড়াইয়া যায়; কিন্তু দিন যে পালটাইয়াছে! বরং প্রায় ২০০ বত্সর পূর্বে লেখা মদনমোহনের কবিতার প্রথম দুইটি লাইন কাহারো কাহারো ক্ষেত্রে একটু পরিবর্তিত হইয়াছে। তাহারা বলেন—‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,/ সারা দিন আমি যেন মিথ্যে কথা বলি।’ এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদের বিষয়বস্তু। ঐ সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে—উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো অনিয়ম দেখিলেই সেই বিষয়ে অভিযোগ করিতে নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো বিষয় কোনো প্রার্থী বা কোনো ব্যক্তির নজরে আসিলে তাহারাও নিজ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিকট, রিটার্নিং কর্মকর্তা/ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট অথবা উপযুক্ত ক্ষেত্রে থানায় বা ফৌজদারি আদালতে অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবেন বা নির্বাচন কমিশনের নিকট অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবেন।
কী দারুণ কথা! শুরুতেই আমরা বলিয়াছি, ভালো কথা শুনিতে বা পড়িতে কাহার না ভালো লাগে! আমাদের ইসির এই কথাগুলিও ভালো লাগিয়াছে! তাহার পর মনে পড়িয়াছে তর্কালঙ্কারের কবিতাখানি। এবং তাহার পর মনে পড়িয়াছে প্রায় ১০ মাস পূর্বে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি উপজেলায় পৌর নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনা। সেইখানে কী জানি হইয়াছিল! মনে পড়িতেছে না? আমরা বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি। ১০ মাসের পূর্বের ঘটনা ভুলিবার মতো না হইলেও, যেই সংবাদ নির্বাচন কমিশনকে বিব্রত করিবে, সেই সংবাদ কোন দুঃখে মনে রাখা হইবে? আমরা একটুখানি মনে করাইয়া দিতে পারি। সেই সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি উপজেলায় পৌর নির্বাচনের অনিয়ম লইয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেই সকল সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছিল—প্রশাসনের নাকের ডগায় সন্ত্রাসীরা গাড়িবহর লইয়া ঘুরিয়া বেড়াইলেও, নির্বাচন আচরণবিধি বারবার লঙ্ঘন করা হইলেও, প্রশাসন হইতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই। অথচ সেই সময়ও নির্বাচনকে সুষ্ঠু করিবার জন্য সকল পর্যায় হইতে ঘোষণা দেওয়া হইয়াছিল—‘যে কোনো মূল্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা হইবে।’ প্রশ্ন হইল—এই ধরনের ঘোষণা কি কেবল বাত-কা-বাত? এই প্রশ্ন করিবার কারণ হইল, সেই নির্বাচনের পূর্বের দিন রাতে পাঁচটি কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরার লাইন কাটিয়া ইভিএমে ভোট কারচুপি ঘটানো হইয়াছিল—যাহা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে অকপটে স্বীকার করিয়াছিলেন। সিসি ক্যামেরার লাইন কাটা পাঁচটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখিবার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন তখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিতেন; কিন্তু তাহা করা হয় নাই। বরং এই ‘বল’ অন্য কোর্টে ছুড়িয়া দেওয়া হইল, সেই ‘বল’ গিয়া পড়িল আরো দূরে, এবং তাহার পর উহা এক অর্থে হিমাগারে চলিয়া গেল।
এই যদি হয় স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনি হাঁড়ির মধ্যকার একটি চাউলের চিত্র, সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কি অধিক কথা বলা উচিত? তাহা কি শোভা পায়? পূর্বেকার দিনের অধিকাংশ মা তাহার ছোট্ট শিশুটির চোখে কাজল পরাইয়া দিতেন। তাহাতে অন্তত ঐ শিশুটির মধ্যে চক্ষুলজ্জা বলিয়া একটি ভালো গুণ তৈরি হইত। এখন অধিকাংশ মা তাহাদের বাচ্চাদের চোখে আর কাজল পরান না। সেই জন্য মানুষের মধ্যে চক্ষুলজ্জাও যেন এখন ক্রমশ কমিয়া গিয়াছে। ঢাকাইয়া কুট্টিদের মতো আমাদের মনেও কথাটি গুঞ্জরিত হয়—‘আস্তে কন হুজুর, হুনলে ঘোড়ায় ভি হাসব!’ যেই কথা শুনিয়া ঘোড়াতেও হাসিবে, সেই কথা বলিবার দরকার কী? কী দরকার এইভাবে মানুষ হাসানোর?
