বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ব্যক্তিপূজা এক অশনিসংকেতের নাম

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০৪:০০

সমগ্র পৃথিবীতে আজ ব্যক্তিপূজা মারাত্মক রূপ ধারণ করিয়াছে। বিষয়টি কতটা ভয়ংকর তাহা কল্পনাও করা যায় না; কিন্তু ইহা লইয়া তেমন একটা উচ্চবাচ্য আছে বলিয়া মনে হয় না। ইহা গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক; কিন্তু তাহার পরও সর্বত্র চলিতেছে ব্যক্তিপূজার প্রতিযোগিতা ও জয়জয়কার। বিশেষত, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ইহা একটি ব্যাধিতে পরিণত হইয়াছে।

ব্যক্তিপূজাকে ইংরেজিতে বলা হয় পারসোনালিটি কাল্ট (Personality Cult)। কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশকে বলা হয় পারসোনালিটি কাল্ট বা ব্যক্তিপূজা। ইহা আতঙ্কজনক এই কারণে যে, যত বড়ই হউন, মানুষ হিসাবে সেই ব্যক্তিটিরও ভুলবিভ্রান্তি-বিচ্যুতি হইতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিপূজারিরা তাহার ধার ধারেন না। তাহাদের নিকট তোষামোদি হইল এক মোক্ষম অস্ত্র ও শিল্প। ইহার মাধ্যমে তাহারা অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় লইয়া নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল করে। স্বার্থ যত বড়, ভক্তি বা পূজার উপকরণ, আয়োজন ও প্রকাশও তত বড়। এমনিতে বাংলায় পূজা কথাটি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্চনা, আরাধনা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহূত হইলেও ইহার আরেকটি দ্যোতনা রহিয়াছে। গুণকীর্তন বা স্তূতির নামও পূজা। এমনকি আমরা যে সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করি, তাহাও এক অর্থে পূজার নামান্তর; কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিবিশেষ বা নেতার প্রতি অতিমাত্রায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে গিয়া একসময় এমন অবস্থাও তৈরি হয়, যাহা অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নহে। ইহার কারণে বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতবাদের সর্বনাশ হইয়াছে। দেখা দিয়াছে ফেরকা বা ভাঙন। যেমন—অনেকে মনে করেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মূল অনুঘটক ব্যক্তিপূজা। এমনিতেই কমরেডদের নিষ্ঠা, সততা, সংগ্রামী চেতনা ও জীবন উত্সর্গ করিতে প্রস্তুত থাকাটা প্রশ্নাতীত; কিন্তু বিপ্লব-উত্তর চার দশকে সোভিয়েত সমাজদেহে যে প্রধানতম ক্ষত তৈরি হয়, তাহার জন্য দায়ী ব্যক্তিপূজা। ১৯৭৪ সালের দিকে সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন ভুগিতেছিল ব্রেজনেভ ম্যানিয়ায়। তাহার ছবি প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যাইত। মাস্টারদের ক্লাস তাহার বন্দনা ছাড়া শুরু করা যাইত না। থিসিসের প্রথম অধ্যায়ে তাহার বাণীর উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে কি আমরা ইহারই প্রতিফলন দেখিতে পাইতেছি না? সরকারি আমলা হইতে শুরু করিয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মী এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগের লোকজনও কি ব্যক্তিপূজায় নিমগ্ন নহেন? একদিকে ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, অর্থপাচার, ব্যাংক লোপাট ইত্যাদি অপকর্ম বাড়িতেছে, অন্যদিকে সমানতালে বাড়িতেছে ব্যক্তিবন্দনা। ইহার মাধ্যমে সকল অন্যায়-অপকর্ম কি জায়েজ বা হালাল করিবার বন্দোবস্তু করা হইতেছে না?

ব্যক্তিপূজার নামে এই ভক্তিবাদ প্রদর্শনের হেতু কী, তাহা আজ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। তবে ইহার পরও অনেকে রহিয়াছেন যাহারা ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নহেন। তাহারা দল বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যেইটুকু না বলিলেই বা না করিলেই নহে, তাহাই করেন বা বলেন মাত্র; কিন্তু প্রতিষ্ঠান বা পারফরম্যান্সের চাইতে ব্যক্তিবিশেষের বন্দনায় শুধু হিতে বিপরীতই হয়। উত্তর কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যক্তিবিশেষই আজ প্রধান কথা। এইরূপ সমাজ ও রাষ্ট্র টিকসই হইতে পারে না। কোনো না কোনো সময় ভিতর হইতেই ভাঙিয়া পড়িবার দশা যে হইবে না তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। এই জন্য আমরা দেখি, ইসলাম ধর্মে ব্যক্তিপূজা বা তাক্বলিদ নিষিদ্ধ। প্রিন্সিপাল বা মূলনীতির অনুসরণকে প্রাধান্য না দিয়া ব্যক্তিপূজার ফল হয় অশুভ; কিন্তু ইহা যখন সর্বনাশ ডাকিয়া আনে, তখন আর কিছুই করিবার থাকে না। তখন পূজার্হ ব্যক্তির নায়ক হইতে খলনায়কে পরিণত হইতে সময় লাগে না।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন