শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হজের গুরুত্ব ও ফজিলত

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০২:৫৬

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা, ওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুলক; লা শারিকা লাক। হজ উপলক্ষে এই তালবিয়া পাঠ করতে হয়। এখানে হজের আভিধানিক অর্থ হলো ইচ্ছা করা, দৃঢ় সংকল্প করা ইত্যাদি। শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহর সান্নিধ্যলাভের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট কার্যাবলি সম্পাদন করাকে হজ বলে। হজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত; ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি; যা স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও পূর্ণ আনুগত্যের প্রতীক। স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার ভালোবাসার পরীক্ষার চূড়ান্ত ধাপ হলো হজ। জিয়ারতে বাইতুল্লাহর মাধ্যমে খোদাপ্রেমিক মুমিন বান্দা তার মালিকের বাড়িতে বেড়াতে যায়, অনুভব করে দিদারে ইলাহির এক জান্নাতি আবেশ। কলুষমুক্ত হয় গুনাহের গন্ধে কলুষিত অন্তরাত্মা। হজের মাধ্যমে মুমিনের আত্মিক, দৈহিক ও আর্থিক ইবাদতের সমাবেশ ঘটে। প্রত্যেক সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ এবং এর অস্বীকারকারী কাফের।

মহান আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, আর এই ঘরের হজ করা হলো মানুষের ওপর আল্লাহর প্রাপ্য; যার সামর্থ্য রয়েছে বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার। আর যে এটা অস্বীকার করবে—আল্লাহ বিশ্বজগতের সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। (সুরা আল ইমরান, আয়াত :৯৭) মহান আল্লাহ তাআলা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আরো ইরশাদ করেন, আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করুন। তারা আপনার কাছে আসবে দূর-দূরান্ত থেকে পদযোগে ও সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে আরোহণ করে। (সুরা হজ, আয়াত:২৭)

এখানে সামর্থ্য বলতে শারীরিক ও আর্থিক উভয় ধরনের সামর্থ্যকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং, সামর্থ্যবান হলে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি, দ্বিধা-সংশয় ও ভ্রান্ত ধারণা ছেড়ে দিয়ে অনতিবিলম্বে হজ আদায় করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য বাঞ্ছনীয়। এ ব্যাপারে প্রিয়নবি (স.) ইরশাদ করেন, তোমরা ফরজ হজ আদায়ে বিলম্ব কোরো না। কেননা, তোমাদের জানা নেই, পরবর্তী জীবনে তোমরা কী অবস্থার সম্মুখীন হবে। (মুসনাদে আহমদ :২৮৬৭)  আর সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যারা হজ না করে মারা যায়, বিচার দিবসের একমাত্র সুপারিশকারী মহানবি (স.) তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত শক্ত মনোভাব পোষণ করেছেন। মহানবি (স.) ইরশাদ করেন, সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যে হজ না করে মারা যায়, সে ইহুদি হয়ে মারা যাক বা খ্রিষ্টান হয়ে মারা যাক, তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই। (তিরমিজি :৮১২)

পক্ষান্তরে যারা মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে হজ আদায় করে, মহানবি (স.) তাদের ব্যাপারে গুনাহ মাফ ও জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এমনভাবে হজ আদায় করল যে, কোনোরূপ অশ্লীল কথা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়নি, সে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে। (বুখারি :১৫২১) প্রিয় নবি (স.) আরো ইরশাদ করেন, হজ ও উমরাকারীগণ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার মেহমান। তারা যদি আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তবে তিনি তা কবুল করেন। আর যদি তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তাহলে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ :২৮৯২) এছাড়া হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, হজে মবরুর তথা মকবুল হজের প্রতিদান হলো জান্নাত। (বুখারি :১৭৭৩) আবার হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, কোনো হাজি সাহেবের সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাত্ হলে তাকে সালাম করবে, তার সঙ্গে মুসাফাহ করবে এবং তিনি নিজ গৃহে প্রবেশের আগে তার কাছে দোয়া কামনা করবে। কারণ তিনি নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এসেছেন। (ইবনে মাজাহ :৩০০৪)

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার মসজিদ তথা মসজিদে নববিতে লাগাতার ৪০ ওয়াক্ত নামাজ এমনভাবে আদায় করে যে, এর মধ্যে এক ওয়াক্ত নামাজও ছোটেনি, তাকে মুনাফেকি ও জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। (মুসনাদে আহ্মদ :১২৫৮৩) 

তাই প্রত্যেক বাইতুল্লাহর মুসাফিরের উচিত অত্যন্ত আদব, ভক্তি, বিনয় ও মহব্বত নিয়ে সোনার মদিনায় হাজির হয়ে রসুলুল্লাহ (স.)-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করা এবং তার শানে অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা।

লেখক: মুফাসিসরে কুরআন, খতিব ও প্রিন্সিপাল, মারকাজুল উলুম আজিজিয়া মাদ্রাসা, কাজলা (ভাঙ্গাপ্রেস), যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন