সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

লোভের কোপে ক্ষতবিক্ষত লালমাই পাহাড়

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০১:৫৫

কুমিল্লার ঐতিহ্যের লালমাই পাহাড় মাটিদস্যুদের জুলুম আর লোভের কোপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। কোথাও উন্নয়নের নামে, আবার কোথাও সরকারি-বেসরকারি নতুন স্থাপনা নির্মাণ, বিনোদন পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক সম্প্রসারণ বা নানা ছুতায় দিনের আলো ও রাতের আঁধারে চলছে প্রকৃতির দেওয়ালখ্যাত এই পাহাড় লুট। মেশিনে কেটে ড্রাম্প ট্রাক-ট্রাক্টরে করে মাটি লুটের কারণে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ি বন। দুর্বৃত্তরা পকেটে ভরছে টাকা। একের পর এক পাহাড়-টিলা ন্যাড়া হতে থাকলেও পাহাড়ের বোবা কান্না যেন থামানোর কেউ নেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। বন ও বনের নানা প্রাণী এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলতে থাকলে অচিরেই হারিয়ে যাবে পাহাড়ের অস্তিত্ব-চিরচেনা রূপ।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, লালমাই-ময়নামতি পাহাড় উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১১ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২ মাইল চওড়া। এ পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪৬ মিটার। অমূল্য প্রত্নসম্পদে ভরা এই পাহাড়। সূত্র জানায়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক নির্মাণ, রাস্তার সম্প্রসারণ এবং ব্যক্তি প্রয়োজনে যে কোনো নির্মাণকাজের জন্য সবার দৃষ্টি আগে পড়ে লালমাই পাহাড়ের দিকে। এরই মধ্যে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশের মাটি কেটে বিক্রি ও দখল করে নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের জামমুড়া এলাকায় ডাইনোসর পার্কের পেছনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল একটি পাহাড়ের রাস্তার পাশের অংশ ঠিক রেখে পেছনের অংশের মাটি কেটে সমতল করা হয়েছে। কোটবাড়ি জাদুঘর থেকে পশ্চিমের সড়কে কাশবন নামের দুটি পার্ক ও রিসোর্ট, ব্লু-ওয়াটার পার্ক, ডাইনোসর ও ম্যাজিক প্যারাডাইসসহ কয়েকটি বিনোদন পার্ক নির্মাণে কমবেশি পাহাড় ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে।

এছাড়া মাটি লুটের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে পাহাড়ের শ্রীবিদ্যা, জামমুড়া, লালমাই, বিজয়পুর, হরষপুর রাজারখোলা, গলাচিপা, সালমানপুর, কোটবাড়ি, সানন্দা, রাঙ্গামুড়া, ষাইট কলোনি, বড়বাতুয়া, ভাঙ্গামুড়া, চৌধুরীখোলা, ধনমুড়া, হাতিগাড়া, চণ্ডিপুর, রতনপুর, বড় ধর্মপুর, উত্তর লক্ষ্মীপুর, রাণী ময়নামতি প্রাসাদের পাশেসহ বিভিন্ন স্থানে। এসব স্থানে পাহাড়ের মাটি কাটার ফলে অনেক এলাকা এরই মধ্যে অনেকটা সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বড় ধর্মপুর এলাকায় একটি বিশাল পাহাড় কাটা শুরু করেছে মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এসব মাটি রাতের আধারে ট্রাক্টরে করে অন্যত্র নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন। এছাড়াও পাহাড়ের সালমানপুর এলাকার একটি টিলার অধিকাংশ অংশের মাটি লুটে নেওয়া হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ফিজিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানার বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে পাহাড় কাটা হয়েছে, বর্তমানেও চলছে। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মালিকানা দাবি করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সাইনবোর্ড।

কুমিল্লা নাগরিক ফোরামের সভাপতি কামরুল আহসান বাবুল বলেন, সরকারি-বেসরকারি ছাড়াও ব্যক্তি প্রয়োজনে মাটির জন্য সকলের নজর পড়ে পাহাড়ের দিকে। অনেকেই পাহাড়ের মাটি বিক্রি করে অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তারা অর্থবিত্তে ফুলে ফেঁপে উঠলেও পাহাড় দিনে দিনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তদারকির অভাবে পাহাড় এখন অনেকটা ধ্বংসের পথে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি কিংবা ব্যক্তি মালিকানার পাহাড় অনুমতি ছাড়া কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণে পাহাড় কাটা থামছে না। এ বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে, জড়িতদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবাইয়া খানম বলেন, পাহাড় কাটার খবর পেলেই আমরা অভিযান পরিচালনা করে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দিয়ে থাকি। তবে পাহাড়ের বেশ কিছু অংশ বন বিভাগের, তারা পাহাড় কাটা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তারা (বন বিভাগ) চাইলে আমরা যে কোনো সময় সহযোগিতা করব। পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজীব বলেন, পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মাটি কাটা প্রতিরোধে প্রায়সময় স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করে আসছি। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান বলেন, যে কোনো মূল্যে প্রাকৃতিক সম্পদ পাহাড় রক্ষা করতে হবে। এজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিসহ সব মহলকে সচেতন হতে হবে। পাহাড় কাটার তথ্য যখনই আসে তখনই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে।

ইত্তেফাক/এসটিএম