বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শান্তি নাই, ধৈর্য রাখিতে হইবে

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০৮:৩৫

দুই দুইটি বৃহৎ যুদ্ধ এবং নানাবিধ ঘটনা-দুর্ঘটনা, নাটকীয়তা ও রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়া যখন বিংশ শতাব্দীর পরিসমাপ্তি ঘটিল, তখনই আঁচ পাওয়া গিয়াছিল, বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস এক অন্ধকার কানাগলিতে প্রবেশ করিতে চলিয়াছে। একবিংশ শতাব্দীর বিভক্তিপূর্ণ বিশ্ব সত্যিকার অর্থেই অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে অস্থির ও অস্থিতিশীল হইয়া উঠিয়াছে, যাহা অগ্রাহ্য করিবার শক্তি কাহারো নাই। অবস্থাদৃষ্টে পরিষ্কার বুঝা যায়, সত্তর বা আশির দশকের ন্যায় স্নায়ুযুদ্ধের কঠিন যুগ পার করিতেছে বিশ্ব। পরাশক্তিগুলির মধ্যে যেই ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ চলিতেছে, তাহার অভিঘাতে ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন। দেশগুলির উপর দিয়া বিশ্বরাজনীতির গরম বাতাস বহিয়া যাইতেছে। ইহার প্রকোপে প্রকম্পিত হইতেছে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র। কোনোখানেই যেন শান্তি নাই। কি ধনহীন, কি ধনবান— শান্তির অন্বেষণ করিতেছেন সকলেই।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধবিগ্রহের কারণে দেশে দেশে অর্থনৈতিক অস্থিরতাও চরম আকার ধারণ করিতেছে। দুঃখজনকভাবে এইরূপ অবস্থার মধ্যেও বিভিন্ন দেশে থামিয়া নাই রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ মিলাইবার ব্যতিব্যস্ততা! রাজনৈতিক মামলা-হামলা, দমনপীড়ন, অবিচার-অত্যাচারের স্টিমরোলার চলিতেছে অনেক অঞ্চলের জনজীবনে। উপরন্তু, রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা ক্রমশ ধারণ করিতেছে এক জটিল ও কঠিন আকার। সকল কিছু মিলাইয়া বহুমাত্রিক সমস্যায় পর্যুদস্ত উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের জীবনজীবিকা ও মানসিক অবস্থা কতটা নাজুক পর্যায়ে উপনীত, তাহা চিন্তারও বাহিরে!

ইহার পরও কথা থাকিয়া যায়। শান্তিই যেইহেতু মানুষের আলটিমেট এক্সপেক্টেশন, তাই শান্তির অনুসন্ধানে অবিচল থাকিতে হইবে প্রতিকূল-অস্থির সময়ে দাঁড়াইয়াই। প্রশ্ন হইল, ‘শান্তি’ আসলে কী? অর্থবিত্ত বা ক্ষমতা? অবশ্যই না। প্রকৃত জ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, শান্তি হইল ‘স্টেট অব মাইন্ড’ তথা শান্তি হইল ‘মানসিক ব্যাপার’। লক্ষ করিলে দেখা যাইবে, মানুষ ব্যতীত সকল প্রাণীই তুষ্ট থাকে কেবল খাদ্যের সংস্থান হইলেই। এই ক্ষেত্রে মানুষ সত্যিই বড্ড অদ্ভুত! খাদ্যের নিশ্চয়তাই মনুষ্যকুলকে তুষ্ট-শিষ্ট রাখিতে পারে না। বরং সকল ক্ষেত্রে ‘চাই চাই আরো চাই’—ইহাই যেন তাহার আসল লক্ষ্য! চাই চাই মনোভাবের খেসারত হিসাবে কত কিছু যে নাই নাই হইয়া যায়, তাহা মানুষ ভাবিয়া দেখিবারও সময় পায় না। ইহাই আজিকার দিনের বাস্তবতা। অবস্থা কতটা কঠিন যে, প্রার্থনায় দাঁড়াইয়াও হরহামেশা নানা পার্থিব বিষয়ের উদ্রেক ঘটে মনে! অথচ ধর্মশাস্ত্রের অনুশাসনে সতর্ক করিয়া বলা হইয়াছে, প্রার্থনালয়ে প্রবেশ করিতে হইবে অন্তরকে ‘শূন্য’ (জিরো) করিয়া। সহজ করিয়া বলিলে, বস্তুজগতের বিষয়াদি মাথা হইতে ঝাড়িয়া ফেলিয়া নিবিষ্ট মন ও চিত্তে সৃষ্টিকর্তার সম্মুখে হাজির হইতে হইবে। জীবনপথে সফলকাম হইবার প্রশ্নে ইহা অতি জরুরিও বটে। রসুল (স.) বলিয়াছেন, ‘নামাজের সময় আল্লাহতায়ালা বান্দার প্রতি সর্বক্ষণ (রহমতের) দৃষ্টি রাখেন, যতক্ষণ নামাজি অন্য কোনো দিকে দৃষ্টি না দেয়। যখন সে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরায়, তখন আল্লাহতায়ালা তার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন (মুসনাদে আহমদ : ২১৫০৮)। সুতরাং, যে কোনো পরিস্থিতিতেই মনকে শান্ত রাখা অনেক বেশি জরুরি।

সুতরাং চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি হইতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারি। মাটিতে কোনো গর্ত তৈরি হইলে তাহা যদি কেহ পূরণ না-ও করে, একটি সময়ে প্রকৃতির আপন নিয়মে তাহা মাটিভর্তি হইয়া যায়। এই অর্থে, বর্তমান বিশ্বে যেই অস্থিরতা চলিতেছে, তাহারও একসময় পরিসমাপ্তি ঘটিবে—ঘটিতেই হইবে। এই অবস্থায় সকল ধরনের অস্থিরতার মুখে মনকে শান্ত রাখিতে হইবে, ধৈর্য ধরিতে হইবে। বৈশ্বিক রাজনীতিতে নূতন বলয় বা মেরু সৃষ্টির যেই কথা আমরা শুনিয়া আসিতেছি বহুদিন ধরিয়া, তাহা নূতন নূতন সমস্যা দাঁড় করাইয়া দিবে আমাদের সামনে। সেই অস্থির, অশান্ত পরিস্থিতিতে দাঁড়াইয়া শান্তির পথ খুঁজিতে ধৈর্য ধারণ ব্যতীত আমাদের সামনে বিকল্প পথ খোলা নাই।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন