বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ইত্তেফাকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিজিএমই'র সভাপতি

টিকে থাকতে কারখানাগুলো মূল্য ছাড় দিয়ে অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছে: বিজিএমই'র সভাপতি

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৩:৩০

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডিজেল ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদকদের ওপর চাপ বেড়েছে। শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়াসহ ব্যাংক সুদের উচ্চহারের কারণে গত পাঁচ বছরে গড়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে কারখানাগুলো টিকে থাকার জন্য মূল্য ছাড় দিয়ে অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলেন, পোশাক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা না গেলে টিকে থাকা কঠিন হবে। তার মতে, কাস্টমস, বন্ড, বন্দর সংক্রান্ত জটিলতা কমানোসহ পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও টেকনোলজি আপগ্রেডের মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনতে হবে। সর্বোপরি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে বিশেষ নীতি সহায়তা ও অর্থায়ন সুবিধার আওতায় আনা গেলে বর্তমান সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।  

ইত্তেফাক :পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে আপনারা নতুন বাজার খুঁজছেন। এক্ষেত্রে সফলতা কেমন?

এস এম মান্নান: নতুন বাজার সম্প্রসারণে আমাদের সফলতা কম নয়। নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি ১৫ বছর আগে ছিল ৮৪৭ মিলিয়ন ডলার, এখন তা ৮ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রপ্তানি বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। সরকারি সহযোগিতার কারণে এটা হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, কোরিয়া এবং সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে আমাদের সুযোগ আছে। এই সহযোগিতা কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে আমরা প্রতিযোগী সক্ষমতা হারাব। ২০৩০ নাগাদ ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ব। ইতিমধ্যে আমাদের সরাসরি রপ্তানিকারী কারখানার সংখ্যা ৫ হাজার থেকে কমে ২ হাজার ২০০তে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে পারতাম, তাহলে রপ্তানি আরো বাড়ত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারত। বিশ্ববাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানির শেয়ার মাত্র ৭.৮৭ শতাংশ। আমাদের সামনে সুযোগ অপরিসীম। সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আমাদের পোশাক খাত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্পের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে, ইনশাল্লাহ।

ইত্তেফাক: পোশাক রপ্তানিতে ভ্যালু এডিশন আরো বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

এস এম মান্নান: আমাদের নিট খাত এখন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। ডেনিম ফেব্রিকের প্রায় ৬০ শতাংশ আমাদের মিলগুলো সরবরাহ করে। এক্সেসরিজের প্রায় শতভাগ দেশে তৈরি হয়। তবে ওভেন ও নন-কটন টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। নিজস্ব প্রোডাক্ট ও ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা ও মার্কেটিংয়ে আরো বিনিয়োগ ও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আমরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছি। আর বিজিএমইএ থেকে প্রোডাক্ট ও ডিজাইন উন্নয়নের ক্ষেত্রে কারখানা পর্যায়ে কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ইনোভেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। অনেক কারখানা এখন উচ্চমূল্যের পোশাক যেমন—জ্যাকেট, স্যুট, আন্ডার গার্মেন্টস ও স্পোর্টসওয়্যার তৈরি করছে।

ইত্তেফাক :রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর একর্ড অ্যান্ড অ্যালায়েন্সের পরামর্শ অনুযায়ী কারখানাগুলো ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সেই অনুযায়ী ক্রেতারা পোশাকের দাম কতটুকু বাড়িয়েছে?

এস এম মান্নান :বিগত ১০ বছরে নিরাপদ কর্মপরিবেশের জন্য প্রতিটি কারখানা ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আমাদের শিল্প এখন শতভাগ কমপ্লায়েন্ট। নিরাপদ কর্মপরিবেশের দিক থেকে আমরা বিশ্বে রোল মডেল। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে গ্রিন কারখানা ছিল আটটি আর এখন আছে ২১৭টি। আরো প্রায় ৫০০টি কারখানা গ্রিন সার্টিফিকেশনের অপেক্ষায় আছে। তবে কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সে এত বিনিয়োগের পরও পণ্যের দাম বাড়েনি, বরং বিগত আট মাসে আমাদের প্রধান প্রধান পণ্যের দরপতন হয়েছে ৬ থেকে ১৮ শতাংশ।

ইত্তেফাক :নানা কারণে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কারখানাগুলোর ব্যবসা ঠিকমতো চললেও এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ কী?

এস এম মান্নান :মূল কারণ হলো, খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে ব্যাবসায়িক সক্ষমতা হারানো। অনেক কারখানা কমপ্লায়েন্সের বাধ্যবাধকতা, ক্রেতাদের কাছ থেকে পেমেন্ট না পাওয়া, করোনা মহামারিসহ বেশ কিছু কারণে বন্ধ হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির পর ক্রেতারা দাম বাড়াচ্ছেন না, এটিও কারখানা বন্ধ হওয়ার একটি কারণ। তবে বিভিন্ন সংকটের সময় সরকার যে সহযোগিতা করেছে, তার ফলে শিল্প আজ ৪৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানিতে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার মাধ্যমে করোনার সময় সরকারের নীতিসহায়তা, স্বল্প সুদে ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে আমরা একটি সমূহ বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আমরা আরো এগিয়ে যেতে পারব।

ইত্তেফাক :বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ না থাকায় শিল্প উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা অসহনীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের কথা বলছেন। আপনার মন্তব্য কী?

এস এম মান্নান :গত পাঁচ বছরে বিদ্যুতের মূল্য সাড়ে ৩৩ শতাংশ, গ্যাসের মূল্য ২৮৬.৬ শতাংশ, ডিজেলের মূল্য ৬৪.৬২ শতাংশ বেড়েছে। দফায় দফায় দাম বাড়ানো হলেও আমরা সে অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না। বরং শিল্পাঞ্চলের বাইরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ দেওয়া হচ্ছে। এটি বিনিয়োগ ও রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করবে। অনেক কারখানা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে, এখন বিদ্যুত্-গ্যাসের সংযোগ না দিলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেই সঙ্গে অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি, যেন এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয় এবং শিল্পাঞ্চলের কাজ শেষ হওয়া ও জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া পর্যন্ত যেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা হলে উদ্যোক্তারা সঠিকভাবে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করতে পারবেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আমাদের আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ইত্তেফাক :বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নেতারা সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন হয়ে থাকেন। তার পরেও ব্যবসায়ীরা সংকটে থাকেন কেন?

এস এম মান্নান :ব্যবসায় সংকট থাকবেই। কারণ আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করি, এখানে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সহায়তা দিলে আমরা পিছিয়ে পড়ি। আবার সরকারের সক্ষমতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তবে সব মহল থেকে সদিচ্ছা প্রয়োজন, যেন কোনোভাবে শিল্প বাধাগ্রস্ত না হয়। বিশেষ করে ব্যবসার প্রয়োজনে যে সেবাগুলো আমাদের দরকার, সেগুলো যেন আমরা হয়রানিমুক্তভাবে দ্রুত পেতে পারি, সেটি প্রয়োজন।

ইত্তেফাক :বাংলাদেশের পোশাক খাতের উন্নয়নে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিতে চান? সরকার কী কী কাজ করতে পারে?

এস এম মান্নান :পোশাক খাতের বর্তমান চ্যলেঞ্জগুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা, যেমন—কাস্টমস, বন্ড, বন্দরসংক্রান্ত জটিলতা কমানো। আরএসসিকে আরো সেবা ও শিল্পবান্ধব করা। পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। ইউনিফাইড কোড অব কন্ডাক্ট। দক্ষতা ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকনোলজি আপগ্রেডের মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো বিশেষ নীতিসহায়তা ও অর্থায়ন সুবিধার আওতায় আনা। কমপ্লায়েন্সের মান বজায় রেখে পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরিতে শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো। শ্রমিকদের জন্য ফুড রেশনিং চালু করা। শিল্পকে বহুমুখী করা, যাতে অল্প কিছু পণ্য ও বাজারের মধ্যে আমরা সীমাবদ্ধ না থাকি, এটি  আমাদের দুর্বল প্রাইস নেগোসিয়েশনের অন্যতম কারণ। নতুন বাজার, নতুন পণ্য ও নন-কটন টেক্সটাইলে বিনিয়োগ আনার কৌশল নিয়ে কাজ করব। কারণ ভবিষ্যতে এই নতুন খাতগুলো থেকেই আমাদের প্রবৃদ্ধি আসবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ২০২৬-এর পর সময়োপযোগী নীতিসহায়তা আনা এবং বাজারসুবিধা ধরে রাখতে সরকার ও বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করা। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার জন্য এক্সিট পলিসি প্রণয়ন। পাশাপাশি ভারতের ন্যায় এক্সপোর্ট ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা প্রবর্তন করা, যেন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে কারখানা দেউলিয়া না হয়ে পড়ে। ম্যান মেড ফাইবারভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ উত্সাহিত করার জন্য বিশেষ নীতিসহায়তা আনা। 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন