রোববার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

২৪ বছরেও চালু হয়নি ডলুরা শুল্কবন্দর

প্রতি রাতে বসে চোরাই হাট, কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ০৪:০০

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ডলুরা সীমান্তে প্রায় প্রতি রাতেই বসে চোরাই হাট। হাজার হাজার বস্তা চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, বিভিন্ন জাতের মসলাসহ নানা ধরনের প্রসাধনসামগ্রী নৌকায় ও স্থলপথে এসে এগুলো রাতের আঁধারে আব্দুজ জহুর সেতু পার হয়ে সিলেট বা রাজধানীতে পৌঁছায়। এর সঙ্গে মাদকও আসে। বিষয়টি অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’। জেলার দায়িত্বশীলেরা বলছেন, ডলুরায় প্রস্তাবিত ইমিগ্রেশনসহ শুল্কবন্দর চালু হলে চোরাচালান অনেকটা কমে গিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ত। তারা বলেন, ‘যারা এখন চোরাচালান করছে, তারাই আমদানিকারক হয়ে যাবে।’

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘উত্তর সুনামগঞ্জসহ এই জেলাকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে ডলুরায় ইমিগ্রেশনসহ শুল্কবন্দর চালু খুব জরুরি।’ সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি খায়রুল হুদা চপল বলেন, ‘তাহিরপুরের তিন শুল্কবন্দর হওয়ার আগেও ওদিকে চোরাই পথে কয়লা আসত। সেখানে বন্দর হওয়ায় অনেকেই আমদানিকারক হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তারা বৈধভাবে ব্যবসা করছেন। সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছেন। ডলুরায় শুল্কবন্দর হলেও এমনটা হবে।’ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান বখত পলিন বলেন, ‘এখানে শুল্কবন্দর হলে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে। জেলার অর্থনৈতিক চিত্রও বদলে যাবে।’

সূত্রমতে, ১৯৯৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এক বছরের জন্য শুল্কবন্দর চালু করতে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ-ভারত। কিন্তু সীমান্তের ওপারের আড়াই কিলোমিটার সড়ক নির্মিত না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আর আগায়নি। তবে ২০০৮ সালের পর সীমান্তের ওপারে সড়ক নির্মাণ এবং এপারে নৌ ও সড়কপথের সুবিধা হয়েছে। ডলুরায় শুল্ক স্টেশন চালুর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছে সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স। সবশেষ ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি ডলুরায় ১০ একর জমি চিহ্নিত করে এর মূল্য পরিশোধের জন্য জেলা প্রশাসকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন এনবিআর থেকে এ বিষয়ে যোগাযোগ না করায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পরে আরেক দফা তাগাদা দেওয়া হয়। তাতেও কোনো অগ্রগতি নেই। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিজন কুমার সিংহ বলেন, ‘জমি চিহ্নিত ও মূল্য নির্ধারণ করে অনেক আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।’

সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, ভারতের গৌহাটি ও কলকাতা সীমান্ত এলাকা থেকে শিলং হয়ে বাংলাদেশের এই সীমান্তে প্রতি রাতে হাজারো বস্তা চিনি, পেঁয়াজসহ অন্য মালপত্র চোরাই পথে ঢুকছে। প্রথমে আসামের বালাহাট লালপানি এলাকায় ট্রাক বা কনটেইনারে আসে মালামাল। পরে ওখান থেকে সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুরের কলতাপাড়া, রাজাপাড়া, লাউড়েরগড়, ঘুমাঘাট ও সদর কোনা দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর—এ দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকার হাজারো মানুষ রাতে ঘুমায় না। রাতভর সীমান্তের ওপার থেকে পেঁয়াজ, রসুন, দারুচিনি, চিনি, এলাচ, ভারতীয় কসমেটিকস, নানা জাতের ফল চোরাইপথে এপারে নিয়ে আসার কাজ করে। এদের সঙ্গে শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। তাই প্রশাসন নীরব।

ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, একসময় চোরাচালান ব্যবসায়ীরা থাকত আড়ালে, কিন্তু বিশ্বম্ভরপুরের ধনপুর বাজারে রীতিমতো অফিস খুলে বসেছে কেউ কেউ। তারা টাকা আদায় ও টোকেন সরবরাহ করে। এই টোকেনের মাধ্যমে জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ সেতু পর্যন্ত পৌঁছে যায় চোরাই পণ্যের ট্রাক। এখানকার টোকেন নিয়ন্ত্রণ করেন ধনপুর ইউনিয়নের একজন জনপ্রতিনিধি। এ প্রসঙ্গে বিশ্বম্ভরপুরের দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছবাব মিয়া বলেন, ‘গত তিনটি আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি তুলে ধরেছি। ডলুরায় ইমিগ্রেশনসহ শুল্কবন্দর এবং বিশ্বম্ভরপুরে বর্ডারহাট চালু হলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, ভারতের বালাহাট থেকেই চোরাই পণ্য সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে। অথচ বালাহাট বাজার থেকে ১০-১৫ মিনিটের দূরত্বে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের ডলুরার অবস্থান। ভারতীয় অংশে সড়কপথও ঠিকঠাক হয়েছে। ওখানে শুল্কবন্দর হলে মানুষ বৈধভাবে ব্যবসা করবে। কর্মসংস্থান হবে।

ইত্তেফাক/এমএএম