বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলিকে জঙ্গিবাদীদের আস্তানায় পরিণত করতে চাইছে পাকিস্তানি গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টিলিজেন্স বা আইএসআই। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন বা র্যাবের সফল অভিযানের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অত্যাধুনিক অস্ত্র-সহযোগে বাংলাদেশের মাটিকে ফের জঙ্গিবাদী রাজনীতির আস্তানা করে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা রোহিঙ্গাদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছেন। র্যাবের অভিযানে সাফল্যও আসছে।
মানবিকতার কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও বহু শরণার্থী আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অসামাজিক কাজকর্মের আঁতুর ঘর হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। অবিলম্বে আরও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিদেশি শক্তির মদদে তারা আরও ক্ষতিকারক হয়ে উঠবে।
কক্সবাজারে উখিয়া থানার গহিন পাহাড়ে জঙ্গিবাদীদের আস্তানায় গত ১৫ মে অভিযান চালায় বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র্যাব। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আরাফাত ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আস্তানাটি ছিল মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা)। সেই অভিযানে আরসার আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গ্রেনেড ও রকেট সেল উদ্ধার হয়। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরসার দুই কট্টর সন্ত্রাসবাদীকে।
আটককৃতরা হলেন উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো শাহনুর ওরফে মাস্টার সলিম (৩৮) ও বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা মো রিয়াজ (৩৫)। মাস্টার সলিম ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে বালুখালী ক্যাম্প-১৫তে বসবাস শুরু করেন।
এর আগে আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির দেহরক্ষী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে আরসা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ায় মাস্টার সলিমকে আরসার প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সলিমের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। রিয়াজের বিরুদ্ধেও একটি হত্যার মামলা রয়েছে। উদ্ধার করা বেশিরভাগ অস্ত্রই বিদেশ থেকে আমদানি করা। আটকদের জেরা করে আরও তথ্য জানতে চাইছেন গোয়েন্দারা।
কক্সবাজারের ৩২টি ক্যাম্পেই অপরাধমূলক কাজকর্ম চলছে। রোহিঙ্গারা দলগত সশস্ত্র তৎপরতা, মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ বাণিজ্য ও দোকান দখল থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বেড়েই চলেছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের আনাগোনার বিষয়টিও বিশেষভাবে চর্চিত- এমন অভিযোগ উঠছে। এমনকি, একাধিক মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গেও রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো।
রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে গত দেড় বছরে ৮০ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৬৪ জন ও এবছর এখন পর্যন্ত আরও ৩৩ জন হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। মে মাসের প্রথমার্ধেই ক্যাম্পগুলোতে চার কমিউনিটি নেতাসহ ১৭ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেই বিরোধ তুঙ্গে। তাই সেখানে একে অন্যকে খুন করছে। পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।
সবধরনের অপরাধের সঙ্গেই যুক্ত মিয়ানমার থেকে আসা এই শরণার্থীরা। তাদের সামলাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা সচেষ্ট থাকলেও বিদেশি মদদে অপরাধমূলক কাজকর্মের ঠিকানা হয়ে উঠছে এই ক্যাম্পগুলো।
মিয়ানমারে সেনা বাহিনীর হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন। মানবিকতার খাতিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে অনেক অসুবিধার সামিল হতে হচ্ছে।
তবু আওয়ামী লীগের মানবিক সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিপদে ফেলতে চায় না। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিজেরাই বাংলাদেশের জন্য নিত্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে। বিদেশিদের মদদে তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ক্ষতিকারক হয়ে উঠছেন। তাদের তোলাবাজির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরাও।
তরুণী-যুবতীদের দিয়ে দেহ ব্যবসার পাশাপাশি বিদেশে পাচার-বাণিজ্য শুরু করেছে তারা।
এছাড়াও চুরি-ছিনতাই মারাত্মক হারে বেড়ে গেছে। প্রায়ই নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে। ফলে দিন দিন সমস্যা বেড়ে চলেছে। বেশ কিছুদিন ধরে আরসার তৎপরতাও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। আরসার সঙ্গে রয়েছে আইএসআইয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ।
উখিয়ায় ক্যাম্পে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে ১৪ মে সোমবার উখিয়ার একটি ক্যাম্পের হেড মাঝি মোহাম্মদ ইলিয়াসকে (৪৩) ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে আরসার বিরুদ্ধে।
এর আগে, ১১ মে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা শিবিরে দুষ্কৃতীদের গুলিতে আলম নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনেও উঠছে আরসার নাম। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যেকার অশান্তি এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম আমাদের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে একাধিক সমস্যা চিহ্নিত করেছেন।
রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশগত ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তারা। রোহিঙ্গাদের অনেকেই তরুণী ও মাদক পাচার এবং অবৈধ কারবারিতে যুক্ত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। রোহিঙ্গারা পরিবেশের জন্য অবশ্যই বড় বিপদ হয়ে উঠেছেন। তবে সবচেয়ে ক্ষতিকারক হয়ে উঠেছে মাদক পাচারচক্র।
রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশ মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত। তারা বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করছে মাদক সেবনে। ফলে দেশের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। সহজেই প্রচুর অর্থ উপার্জনের লালসায় তারা শুধু আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাই নয়, নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। কারণ মাদকের পাশাপাশি তারা এখন অস্ত্র চোরাকারবারেও হাত লাগিয়েছে।
আরসা সশস্ত্র গোষ্ঠীটি হারাকাহ আল ইয়াকিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আরসার প্রতিষ্ঠাতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনজুনি এলিয়াস হাফিজ তোহার জন্ম পাকিস্তানে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধী বাংলাভাইসহ জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ, হিজবুত তাহরীর ইত্যাদি মৌলবাদী সংগঠনের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ বহুদিন আগেই বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সবসময় বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কাজ করে থাকে। আরসা প্রধান আতাউল্লাহ পাকিস্তানি হওয়ায় এ এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বিশেষ সহায়ক। আইএসআই তাদের অস্ত্র ও অর্থ দুটোই সরবরাহ করছে’।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বহুদিন আগে স্বীকার করেন, ‘রোহিঙ্গারা দিন দিন বিষফোঁড়া হয়ে যাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি’। চেষ্টা চলছে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে আইএসআইয়ের প্রভাবমুক্ত করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলির অপরাধমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে। নইলে বিপদ আমাদের।

