শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বলিয়া কিছু নাই

আপডেট : ১৮ মে ২০২৪, ০৩:৩০

‘রাজনীতিতে দুর্ঘটনাক্রমে কিছুই ঘটে না; যদি ঘটে, তাহা হইলে চোখ বন্ধ করিয়া বাজি ধরা যায় যে, পূর্ব হইতেই তাহার পরিকল্পনা করা হইয়াছিল।’ কথাটি বলিয়াছেন ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট। তাহার এই অবজারভেশন অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে আমরা সচরাচর এমন সকল ‘দুর্ঘটনা’ ঘটিতে দেখি, যাহা বিশ্বাস করাই কঠিন! বিশেষত, নির্বাচনের সময় এইখানে ঠান্ডা মাথার খেলা চলে। একশ্রেণির নেতাকর্মী পুলিশ-প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করিয়া অন্য দলের নেতাকর্মী বা সমর্থকদের কোণঠাসা করিতে হেন কাজ নাই, যাহা করে না। মিথ্যা, বানোয়াট কিংবা তুচ্ছ মামলায় অযাচিত জেল-জুলুমসহ সম্ভাব্য প্রার্থীকে নির্বাচন হইতে দূরে সরাইয়া দিবার সকল ধরনের বন্দোবস্ত করা হয়। বিগত জাতীয় ও বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচন এই প্রবণতার বাহিরে ছিল না। সম্ভাব্য প্রার্থী এবং তাহার কর্মী-সমর্থকদের কেবল বাড়িছাড়া, এলাকাছাড়াই করা হয় নাই, তিনি যাহাতে ভোটে দাঁড়াইতে না পারেন, সেই জন্য থানায় ডাকিয়া প্রার্থীকে কঠিনভাবে হুমকিধমকি দিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। আইনি মারপ্যাঁচে সেই সকল প্রার্থী ভোটে অংশ নিতে পারেন নাই স্বভাবতই। এমনও ঘটিয়াছে, নামমাত্র অভিযোগে প্রার্থী বা তাহার অনুসারীদের নির্বাচনের আগে গ্রেফতার করা হইয়াছে; কোর্টে তাহাদের জামিন মিলে নাই, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নির্বাচনের পর তাহারা ঠিকই ছাড়া পাইয়াছেন।

বিভিন্ন উঠতি বা পাতিনেতা এবং পুলিশ-প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু অফিসারের জোগসাজশেই যে এহেন অন্যায়-অপকর্ম চলিতেছে, এই কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরিয়া বলিয়া আসিতেছি। সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি ও সুরক্ষা বজায় রাখিতে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথাপি মাদক ও চোরাকারবারি, চাঁদাবাজ, মাস্তান বাহিনী লালনপালনকারী নেতাদের ইশারায় এইভাবে বিরোধী নেতাকর্মীকে হেনস্তা, গ্রেফতার করার ফলে রাজনীতির সুস্থ পরিবেশ বিনষ্ট হইতেছে স্বাভাবিকভাবেই। ক্ষমতাকে এইভাবে অপব্যবহার করিবার কারণে জনভোগান্তির পাশাপাশি ঘরছাড়া-এলাকাছাড়া সেই সকল নেতাকর্মীর পরিবার-পরিজন কী অবর্ণনীয় কষ্টে দিন পার করিতেছে, তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে।

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বলিয়া কিছু নাই—সুদিন বা দুর্দিন যে কোনো সময় ঘুরিয়া যাইতে পারে; কিন্তু সেই সকল নেতার কী হইবে, যাহারা জনগণকে ‘সেতু বানাইয়া দিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া বসেন, যখন সেইখানে কোনো নদীই থাকে না!’ যাহারা ভিন্ন দল ও মতের লোক হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলে ঢুকিয়া পড়িয়াছেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করিবার জন্য এবং সেই উদ্দেশ্যে রাজনীতিকে ব্যবহার করিতেছেন নিজের খেয়ালখুশিমতো, তাহারা পালাইবেন কোথায়? মনে রাখা দরকার, নেতা নামধারী এই সকল ব্যক্তি অর্থবিত্তের জন্য রাজনীতি করেন, যাহার ফলে তাহারা ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিলেও ক্ষতি হইয়া যায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চল, সমাজ ও দেশের এবং সর্বোপরি সেই রাজনৈতিক দলের, যেইখানে তাহারা আশ্রয় লইয়াছেন। অথচ সেই নেতাদের কথাতেই সরকারের বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান চলিতেছে! জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত চাল-ডাল, অর্থকড়ি সকলের নাকের ডগা দিয়া পৌঁছাইয়া যাইতেছে সেই সকল নেতাকর্মীর ডেরায়। পুলিশ-প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সম্পৃক্ততা ব্যতীত ইহা কি আদৌ সম্ভব? সরকারের অজ্ঞাতে এই সকল অপকর্ম চলিতে পারে কীভাবে, তাহাও বড় প্রশ্ন! জানিয়া-বুঝিয়া হউক কিংবা অজ্ঞানতাবশত, এই সকল অসাধু নেতাকে বৈতরণি পার করিতে সহায়তা করিবার মধ্য দিয়া পুলিশ-প্রশাসনের ঐ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের ও জনস্বার্থের যেই ক্ষতি সাধন করিতেছেন, তাহার বিহিত হওয়া জরুরি।

স্মর্তব্য, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করিবার রাজনীতি সর্বদাই বিপজ্জনক। ব্যক্তিস্বার্থে আজ যাহারা রাজনীতিকে ব্যবহার করিতেছেন, একদিন না একদিন তাহার হিসাব হইবেই। যাহারা রাজনীতিতে বাজে দৃষ্টান্ত রাখিয়া যাইবেন, তাহাদের খোঁজ হইবেই একটি সময়ে আসিয়া—হউক দশ, বিশ, পঞ্চাশ বা এক শত বত্সর পর। বস্তুত, খারাপ রাজনীতি সমাজে কেবল খারাপ মাত্রাই যোগ করে।

বর্তমান সমাজ রাজনৈতিক সচেতনতাপ্রবণ—ইহা ইতিবাচক বটে। কারণ, ইহার ফলে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আসে। তবে অন্য দলের নেতাকর্মীর উপর দমনপীড়ন চালানো কিংবা তাহাদের নির্বাচনের মাঠছাড়া করিবার সংস্কৃতি সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার পরিপন্থি। ইহার প্রতিক্রিয়াও স্বভাবতই সুখকর হয় না! সুতরাং, সেই সকল নামধারী নেতা এবং তাহাদের সহায়তাকারী আমলাদের উদ্দেশে বলিতে হয়—‘ধীরে চলো, আস্তে বহো’।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন