মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কাজ না করিয়া বিল উঠাইয়া নেওয়া হয় কীভাবে?

আপডেট : ১৯ মে ২০২৪, ০৬:৩০

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ১ হাজার কেভিএ বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণ ও ৫০০ কেভিএ জেনারেটর স্থাপনের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২০২০ সালের এপ্রিলে কার্যাদেশ দেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু সেই কাজটি গত চার বত্সরেও শেষ হয় নাই। আরো দুঃখজনক বিষয় হইল, কাজ সম্পন্ন না হইলেও সমুদয় বিল ঠিকই উত্তোলন করা হইয়াছে। কাজ শেষ করিয়া বুঝাইয়া দেওয়ার কোনো উদ্যোগ না নিলে মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট এই সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করেন। ইহাতে তড়িঘড়ি করিয়া দায়সারাভাবে কেবল বসানোর কাজ শুরু করা হয়। ইহাতে নূতন করিয়া নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠে।

প্রকল্পের কাজে কালক্ষেপণ করা কিংবা কাজ না করিয়া বিল উঠাইয়া নেওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে নূতন নহে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইহা বলিতে গেলে মজ্জাগত ব্যাপার হইয়া গিয়াছে। ইহা শুধু রাজশাহী নহে, সমগ্র দেশের চিত্রও অনুরূপ। দক্ষিণাঞ্চলেও এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যায়; কিন্তু ইহার কোনো প্রতিকার হয় না বলিলেই চলে। কেননা যেই সকল ঠিকাদার কাজ না করিয়া বিল উঠাইয়া লইয়া যান কিংবা কাজ অসমাপ্ত রাখিয়া পলায়ন করেন, তাহারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী মহলের সহিত সম্পৃক্ত এবং তাহারা এই অপকর্ম সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহিত যোগসাজশ রাখিয়াই করিয়া থাকেন। নতুবা তাহাদের এই দুঃসাহস হয় কী করিয়া? এই জন্য তাহাদের অনেক সময় কেশাগ্রও স্পর্শ করা যায় না; কিন্তু ইহাতে দেশ ও জাতি যে সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না।

শুধু গণপূর্ত নহে, এলজিইডিসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রহিয়াছে, যেইখানে বিরাজমান একই সংস্কৃতি। প্রশ্ন হইল, কোনো কাজ অর্ধসমাপ্ত বা অসম্পূর্ণ রাখিয়া বিল উঠাইয়া লওয়া হয় কীভাবে? ইহা দেখভাল করিবার জন্য নিম্ন হইতে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তা, যেমন—ওয়ার্ক অ্যাসিসট্যান্ট, এসও, এসডি, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, এসই বা সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), অ্যাডিশনাল চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার রহিয়াছেন। তাহা হইলে তাহারা কী করিতেছেন? তবে সরিষার মধ্যেই যদি ভূত থাকে, তাহা হইলে সেই ভূত তাড়ানো কঠিন। তাই সরকারের উচিত এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করিয়া জনগণের অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। তহবিলসংকট বা অর্থছাড়ে যেই সকল জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা থাকে, তাহারও সমাধান একান্ত কাম্য।

এই সকল অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ বা সীমার মধ্যে রাখিতে পারিলে আমাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল হইবে। আরো আগাইয়া যাইবে অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ। খোদ জাতীয় সংসদে ইহা লইয়া কথাবার্তা যে উঠে না, তাহা নহে। তাহার পরও প্রতিকার মিলে কি? ইহার বিরুদ্ধে জোরালো ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না বলিয়াই আমরা মাঝেমধ্যে জানিতে পারি, রাস্তা নির্মাণ করিতে গিয়া বিটুমিন না দিয়া দেওয়া হইয়াছে আলকাতরা। বিভিন্ন ভবন নির্মাণে রড না দিয়া দেওয়া হইয়াছে বাঁশ। আবার সেই ভবন নির্মাণ চলাকালেই হুড়মুড় ভাঙিয়া পড়িলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা যায় কদাচিত্। টেন্ডারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, কী ধরনের পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করিতে হইবে; কিন্তু তাহা না করিয়া অনেক সময় ব্যবহার করা হয় সস্তা ও নিম্নমানের সামগ্রী। যাহারা এইরূপ করে তাহাদের লাইসেন্স বহাল থাকে কীভাবে? কেন তাহাদের কোম্পানিকে যথাসময়ে ব্ল্যাকলিস্ট বা কালো তালিকাভুক্ত করা হয় না?

ইহার মূল সমস্যা কোথায়, সেই ব্যাপারে অনেকেই অবগত আছেন; কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে? এই রকম শত অন্যায়-অপরাধ করিয়া যখন কেহ নিজ এলাকায় বুক ফুলাইয়া চলে, তখন তাহা জাতির জন্য কি লজ্জাজনক নহে? অতএব, এই ব্যাপারে স্থানীয় জনগণকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন হইতে হইবে। কেননা শেষপর্যন্ত এই সকল অপকর্মের ফল তাহাদেরই ভোগ করিতে হয়। অপচয় বা দুর্নীতির অর্থ চাপিয়া বসে তাহাদেরই ঘাড়ে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন