আজারবাইজানে একটি জলাধার প্রকল্প উদ্বোধনের পর কয়েক জন পদস্থ কর্মকর্তাসহ পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে যাওয়ার পথে এক হেলিকপটার বিধ্বস্তের ঘটনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি মৃত্যুবরণ করিয়াছেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। ঐ হেলিকপটারে রাইসি ছাড়াও ছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান, পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নর মালেক রহমতি এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মুখপাত্র আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলি আলে-হাশেম। ইহাতে হেলিকপটারের সকল আরোহী নিহত হন। গতকাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইহাকে দুর্ঘটনা হিসাবেই বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহার সহিত নাশকতার ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তাহা এখনো কোনোভাবে জানা যায় নাই।
তেহরান রাইসির মৃত্যু নিশ্চিত করিবার পর শোক জানাইয়াছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ শিয়া আল-সুদানি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রমুখ রাইসির মৃত্যুতে গভীর সমবেদনা জানাইয়াছেন। রাইসির মর্মান্তিক মৃত্যুতে ‘গভীরভাবে শোকাহত’ বলিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লিখিয়াছেন, ‘তাহার পরিবার এবং ইরানের জনগণের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। এই দুঃখের সময়ে ভারত ইরানের পাশে আছে।’ বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্টের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে আমরাও গভীরভাবে মর্মাহত, শোকাহত।
ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখিতে পছন্দ করা রাইসির কর্মজীবন বেশ ঘটনাবহুল। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পর্যবেক্ষকদের রীতিমতো চমকাইয়া দিয়াছিলেন রাইসি। যদিও সেই নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করিতে পারেন নাই। ইহার পর রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনাসহ দারিদ্র্য, দুর্নীতি, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার সংকল্প ব্যক্ত করিয়া ২০২১ সালের নির্বাচনে ‘ব্যাপকভাবে বিজয়ী’ হইয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির স্থলাভিষিক্ত হন তিনি।
ইরানের রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই চলিয়া আসে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে দেশটিতে সংঘটিত মহাবিপ্লবের কথা, ইতিহাসে যাহা ‘ইসলামি বিপ্লব’ নামে অভিহিত। ৩৮ বত্সরের শাসক রেজা শাহ পাহলভির পতন এবং ১৬ জানুয়ারি জনরোষের মুখে তাহার দেশত্যাগের মধ্য দিয়া ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাসন হইতে ইরানে ফিরিয়া আসেন গণবিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি। রাজধানী তেহরানের সড়কে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় ইরানে রাজতন্ত্র বাতিল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন খামেনি। ইহার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল, শাহের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শাপুর বখতিয়ারের সরকারকে প্রতিস্থাপন করা। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের সেনাবাহিনী নিজেদের ‘নিরপেক্ষতার’ নীতি ঘোষণা করিলে পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলিয়া যান প্রধানমন্ত্রী বখতিয়ার। পতন ঘটে ২ হাজার ৫০০ বত্সরের রাজতন্ত্রের, চূড়ান্ত জয়ের দেখা পায় ‘ইসলামি বিপ্লব’। ইহার পর সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত হইয়াছে বটে, তথাপি সেই গণবিপ্লব ইরানের মানুষকে কী দিয়াছে, সেই প্রশ্ন আমরা আজ আর করিতে চাহি না।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদনক্রমে রাইসি প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন, যখন তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যা, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিশ্বশক্তিগুলির সহিত পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করিবার আলোচনাসহ নানাবিধ কঠিন চ্যালেঞ্জ ঘিরিয়া ধরিয়াছিল ইরানকে। ইরানের সাবেক বিচার বিভাগীয় প্রধান রাইসি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণের পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হইয়াছে তেহরান, যাহার মধ্যে ২০২২ সালে ইরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ইসরাইল ও ইরানসমর্থিত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে চলমান গাজা যুদ্ধ এবং সর্বোপরি ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার প্রকাশ্য ‘ছায়া যুদ্ধ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে প্রতিবেশী দেশগুলির সহিত সম্পর্ক ভালো রাখিবার ব্যাপারে সর্বদাই নজর ছিল রাইসির। আঞ্চলিক তত্পরতা রক্ষার অঙ্গীকার ব্যক্ত করিয়া মাঝেমধ্যেই নিজেকে ‘স্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি’ হিসাবে দাবি করিতেন তিনি।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পার্বত্য, শুষ্ক এবং জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় দেশ ইরানের সহিত বাংলাদেশের রহিয়াছে দীর্ঘদিনের পথচলা। রাইসি পরবর্তী যুগেও দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকিবে নিঃসন্দেহে। রাইসির মৃত্যুশোক কাটাইয়া উঠিয়া ইরানি জনগোষ্ঠী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিবেন বলিয়া আমরা আশা করি।
