শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি আর কতদিন চলবে?

আপডেট : ২১ মে ২০২৪, ০৫:৩০

বাসমালিকদের উদ্দেশ্য করে একসভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজধানী ঢাকায় অনেক উন্নয়ন হলেও লক্কড়-ঝক্কড় বাস চলাচল বন্ধ হয়নি। এজন্য ১২ বছর মন্ত্রী পদে থেকে কথা শুনতে হয়।’

তিলোত্তমা ঢাকার রাস্তায় হাল ফ্যাশনের গাড়ির পাশে রংচটা, কালো ধোঁয়া ছড়ানো, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি, বাস চলাচল করা নিতান্ত বেমানান। এসব গাড়ির কোনোটির বয়স তেতাল্লিশ বছর পার হয়েছে। এর চেয়ে আরো কত বৃদ্ধ গাড়ি রাজপথে ও দেশের আনাচকানাচে চলাচল করছে, তার কোনো পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। এসব গাড়ির গর্বিত মালিক কারা?

গত বছর পুরোনো গাড়ি ডাম্পিং করার কথা উঠলে একশ্রেণির মালিক না খেয়ে মারা যাচ্ছেন বলে সংবাদ হয়েছিল। এখন তো অতি বৃদ্ধ গাড়ি ধরে ধরে স্ক্রাপিং করার কথা ভাবা হচ্ছে। তাহলে তাদের এবার কী হবে?

অতি বৃদ্ধ গাড়ি স্ক্রাপিং করার পদ্ধতি সব উন্নত দেশে প্রচলিত। সেখানে অতি বৃদ্ধ গাড়ি ধরে ধরে আনতে হয় না। কোনো গাড়ি সরকার-নির্দেশিত বয়সসীমা পার হয়ে গেলে তার লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। উন্নত দেশে লাইসেন্স নবায়ন করা হয় স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে। এতে কোনো নতুন গাড়িও যদি ফেল করে, তাহলে সেটা রাস্তায় চলাচলের অনুমতি পায় না। তিনি বাধ্য হন সেই গাড়ি ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতে।

মজার ব্যাপার হলো, উন্নত বিশ্বে ফিটনেস পেতে ব্যর্থ গাড়ি ডাম্পিং ও স্ক্রাপিং করতে হলে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে সরকারি ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসতে হয়। সেসব ভাগাড় ভর্তি হলে সরকারি লোকেরা নষ্ট গাড়িগুলোকে স্ক্রাপিং করে মণ্ড বানিয়ে লৌহজাত দ্রব্য তৈরির কারখানায় পাঠিয়ে দেয়। স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে ফিটনেস পেতে ব্যর্থ গাড়িকে রিসাইকেল করার নিয়ম নেই। পরিবেশসচেতনতা আইনের কঠোরতা থাকায় তারা নিজেদের দেশে সেসব পুরোনো গাড়ি চালাতে পারে না। জাপান ও কিছু দেশ পাঁচ বছরের পুরোনো কিন্তু সচল গাড়িকে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে।

আমাদের দেশে অবৈধভাবে আমদানি, বেনামি, ফিটনেস-বিহীন, দুর্ঘটনাকবলিত ইত্যাদি গাড়িকে মামলা দিয়ে ধরে এনে থানার পাশে ডাম্পিং করা হয়। বহু থানায় জায়গা না থাকায় রাস্তায় সারিবদ্ধ করে ফেলে রাখা হয়। অনেক সময় ঘুষের ভয়ে মালিকরা গাড়ি ফেরত নিতে আসে না। সেখান থেকে বছরের পর বছর জং ধরে এসব গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে ধোলাই খালে বিক্রি হয়।

কারণ এসব গাড়ির মালিক ও এর তদারকিতে অফিসে ও রাস্তায় দায়িত্বরত কোনো কোনো মানুষের মন খুব গরিব। তাদের জৌলুস ও চেহারা কিন্তু গরিব নয়। তাই কে শোনে কার কথা? ফিটনেস-বিহীন, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িগুলো স্ক্রাপ না হয়ে গোপনে পুনরায় রাজপথে ফিরে আসার অনুমতি পায়।

রাজধানীর একই রাস্তায় রোলস রয়েস, মার্সিডিজ, পাগানি, বিএমডব্লিউ, টেসলা, টয়োটা, ফেরারি ইত্যাদি বিলাসবহুল কারের সঙ্গে ৪৩ বছরের পুরোনো লক্কড়-ঝক্কড় বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, মুড়ির টিন, রিক্সা, ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি চলতে দেখা যায়। দানব মোটরবাইক ফাঁকফোকর দিয়ে পিড় পিড় করে হর্ন বাজিয়ে পথচারীর গা ঘেঁষে চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে। এটাই তো আমাদের পথ চলাচলের চিরায়ত কৃষ্টি!

এর জন্য কোনো মোটিভেশন আজ পর্যন্ত কাজে লাগানো যায়নি। দেশের গ্রামাঞ্চলে, এমনকি হাইওয়েতে চলে নসিমন, করিমন, পঙ্খিরাজ নামক অটোরিক্সা, ভুটভুটি, চান্দের গাড়ি আরো কত কী! নতুন রাস্তায় আধুনিক মোটরবাইক অন্যান্য গড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার কৃষ্টি চালু করেছে সাড়ম্বরে। এসবের গতি নিবারণের জন্য সিসি ক্যামেরা বসালেও অদ্যাবধি দক্ষ ও সত্ জনবল তৈরি করা যায়নি। মুখের কথা ও দেশের বাস্তব অবস্থার মধ্যে এখানেও দুস্তর ব্যবধান তৈরি হয়ে আছে।

বিলাসবহুল সব গাড়ির মালিক অনেক আমলা ও রাজনৈতিক নেতাও। এজন্য নেপথ্যে থাকা মালিকদের চিহ্নিত করতে হবে। এতদিন পরে ‘সাবওয়ে আমাদের করতেই হবে’—এমন বোধোদয় আশার আলো-স্বরূপ। তবে পুঙ্খানুভাবে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ না করে বন্যাপ্রবণ ঢাকায় সাবওয়ের মতো বড় কোনো প্রকল্প তৈরির আগাম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে সাবওয়ে থেকে তেমন কোনো উপকার পাওয়া কঠিন।

কল্পিত পাতাল পথের সঙ্গে ওপরের প্রচলিত পথের কানেকটিভিটির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে মানুষ নিকটস্থ জেলাশহরগুলো থেকে প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিটে ঢাকায় এসে অফিস করে বাড়িতে ফিরতে পারবে। তাহলে জাপানের সাইতামা, চিবা জেলার মতো আমাদের জনগণ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মুন্সিপঞ্জ থেকে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে ঢাকায় চাকরি করতে পারলে ঢাকার ওপর মানুষ ও বসতির চাপ কমবে এবং গরিবি চেহারার পুরোনো যানবাহনগুলো এমনিতেই বিলীন হতে পারে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

ইত্তেফাক/এমএএম