শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বক্তব্যের ভাষাও শিষ্টাচারের অংশ 

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ০৭:৩০

কূটনৈতিক ভাষা ও শিষ্টাচারের মান কী হইবে তাহা লইয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন ও সংস্থার গাইডলাইন রহিয়াছে। যেমন—ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, পেস ইউনিভার্সিটি (নিউ ইয়র্ক), আজারবাইজান ইউনিভার্সিটি বা ডিপ্লো-ফাউন্ডেশনসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা যায়, যাহারা এই বিষয় সুস্পষ্ট করিয়াছে। এই সকল প্রতিষ্ঠানে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও ভাষা লইয়া যাহারা লিখিয়াছেন তাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই শুধু নন, বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করিয়া ভূয়সী প্রশংসা অর্জনকারী ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে স্টিফেন গ্যাসিলির ‘দ্য ল্যাংগুয়েজ অব ডিপ্লোম্যাসি’, অ্যালান জেমসের ‘এ ডিকশনারি অব ডিপ্লোম্যাসি’, রেমন্ড কোয়েনের, ‘দ্য নেগোসিয়েশন অব কালচার’ জোসেফ এ নায়ার ‘সফট পাওয়ার’সহ অনেক বহুল পঠিত গ্রন্থ রহিয়াছে। ইহা পড়িলে বা জানিলে কূটনীতিক বা রাজনীতিবিদ শুধু নহেন, সাধারণ্যেও বিশেষভাবে জানিবেন। তবে সকল কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ বা উচ্চ কর্মকর্তাকে যে এই সকল গ্রন্থ ও গবেষণা পড়িয়া কথা বলিতে হইবে, এমন কোনো কথা নাই, প্রয়োজনও নাই। জহিরুদ্দিন মোহাম্মদ বাবর যে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তাহা জানিতে ইতিহাস পাঠ করিবার প্রয়োজন পড়ে নাই, পৃথিবী যে সূর্যকে কেন্দ্র করিয়া ঘোরে তাহা জানিতেও মহাকাশ বিজ্ঞান পড়িতে হয় না। অর্থাত্ কমন সেন্স হইতেই মানুষ একটা জ্ঞান রাখে, যাহা দিয়া বৈতরণি পার হওয়া যায়। আমরা বহু মহান নেতাকে দেখিয়াছি, যাহারা কোনো গাইডলাইন না পড়িয়াও বহু প্রশংসনীয় শিষ্টাচার বজায় রাখিতে সক্ষম হইয়াছেন, রাজনীতি ও কূটনীতিতে অনুকরণীয় হইয়াছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করিতে হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের বহু অন্যায়ের কথা তুলিয়া ধরিয়াছেন; কিন্তু কখনো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অপমানসূচক কথা বলেন নাই। এমন নেতাও আমরা দেখিয়াছি, চোখের সামনে তাহার ভোট লুট হইতে দেখিয়াও মিডিয়ার কাছে বক্তব্য তুলিয়া ধরার সময় শিষ্টাচার বজায় রাখিতে কার্পণ্য করেন নাই।  ইহাই পরিণত মানুষের বোধ ও বুদ্ধি।

কূটনীতি হয় দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং বিভিন্ন ফোরামে। একজন কূনীতিক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান বা বাংলা—কোন ভাষায় কথা বলিবেন তাহার কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। তবে তিনি কী বলিলেন, কী ধরনের টোন ব্যবহার করিলেন তাহাই মুখ্য। কূটনীতিতে কিছু সততা থাকিতে হইবে বলিয়াও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাহারা বলেন, অন্য পক্ষের সহিত যদি কোনো চুক্তি, কোনো সমঝোতা করিতে গিয়া জনগণের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, অথবা পার্লামেন্টে হইচই বাধিয়া যাওয়ার দেখেন, তাহা হইলে অপরপক্ষের নিকট তাহা রাখঢাক করিতে বারণ করিয়াছেন। এমনকি একটি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অতি সতর্কতার উপদেশ দিয়াছেন। সর্বোপরি যে কোনো আলোচনায়, চুক্তিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিষয়ে মন্তব্যে সর্বদা স্বাভাবিক ভদ্রতা অপরিহার্য বলিয়া তাহারা মনে করেন। যদি কোনো দেশের সহিত বৈরী সম্পর্কও তৈরি হয়, সেই ক্ষেত্রেও ন্যূনতম শালীনতা ও কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার অপরিহার্য। সকলের মনে রাখিতে হইবে, একটি শব্দ বা বাক্য ব্যয়ে একটি দেশের উপর ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে। 

কিন্তু অতি-বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল দেশে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখিতে পাই। অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদে থাকিয়া দেশবিদেশের প্রতিপক্ষের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাহা শিষ্টাচারের কোনো স্তরেই বিবেচনা করা যায় না। বরং অনেকের কথা শুনিলে মনে হয়, পান-দোকানি আর আছিয়ার মায়ের চরম ঝগড়ায় ব্যবহূত শব্দাবলিকেও যেন হার মানায়। যেই সকল পরিণত রাজনীতিবিদ এখনো বিদ্যমান রহিয়াছেন, সকল কিছু অবলোকন করিতেছেন; সেই সকল পরিণত নেতারা বিভিন্ন দেশে দায়িত্বশীল পদে বহাল রহিয়াছেন, তাহারা নীরবে হাসেন বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। সমাজে যাহার যে অবস্থান, সেই অবস্থানকে বুঝিতে পারা এবং সেই অনুসারে কথা বলিতে ও শিখিতে পারাও একটি যোগ্যতা বিবেচনা করা এখন একান্ত প্রয়োজন হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন