রোববার, ১৬ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ইরানের প্রেসিডেন্টের মৃত্যু ভালো কথা নয়

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ০৫:৩০

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সঙ্গে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টদের সম্পর্ক খুব বেশি মধুর ছিল না। আকবর হাশেমি-রাফসানজানি ইসলামিক রিপাবলিককে পশ্চিমা দেশগুলোর খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন। মোহাম্মদ খাতামি বিশ্বাস ও স্বাধীনতার সহাবস্থান নিয়ে কুমন্তব্য করে ইরানের রক্ষণশীল অভিজাতদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। মাহমুদ আহমাদিনেজাদ জনপ্রিয় হলেও সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি। আবার হাসান রুহানি ছিলেন মার্কিনপন্থি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করায় ইরানের প্রথম সারির রাজনীতিবিদের তালিকা থেকে তিনি ছিটকে পড়েন।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ছিলেন ইরানের ধর্মীয় নেতা খামেনির আদর্শ সহযোগী। একজন বাকপটু ও জনপ্রিয় নেতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ৮৫ বছর বয়সি আলি খামেনির প্রতি অবিচলভাবে অনুগত ছিলেন এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী খামেনির পর তার উত্তরাধিকার হিসেবে ইব্রাহিম রাইসি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন—এমন গুঞ্জন উঠেছিল। গত রবিবার হেলিকপটার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসির আকস্মিক মৃত্যু সেই পরিকল্পনার ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর ফলে সেখানে তরুণ প্রজন্মের আরো উগ্র রাজনীতিবিদের ক্ষমতায়নের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পরবর্তীকালে বিদেশি আগ্রাসনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইব্রাহিম রাইসি একজন আদর্শবাদী বিপ্লবী নেতা ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি বিভিন্ন প্রসিকিউটোরিয়াল ভূমিকায় নিযুক্ত হন, যেখানে তিনি নিয়মিতভাবে চলমান শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যত্ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে তাদের মতের বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন। ১৯৮৮ সালে তিনি তথাকথিত ‘ডেথ কমিশনে’ কাজ করার মাধ্যমে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, যখন তিনি ৫ হাজার জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। এরপর তিনি তার কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় খামেনি শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে গেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে উন্নীত হওয়ার আগে তিনি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

ইরানি পর্যবেক্ষকদের মতে এত আনুগত্য থাকা সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট ছিল না যে, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইব্রাহিম রাইসি খামেনির উপযুক্ত উত্তরসূরি হবেন। জনগণের সমর্থন ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিরোধ রেখে লম্বা সময় ধরে সরকার পরিচালনার মতো চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য ধূর্ততা, বুদ্ধিমত্তা এবং নিষ্ঠুরতার একটি অসাধারণ মিশ্রণ প্রয়োজন। রাইসি খামেনির উত্তরাধিকারী ছিলেন কিন্তু তার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত ছিল না। খামেনি তার ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে ইব্রাহিম রাইসি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্বে নিযুক্ত তিন সদস্যের কমিটির অংশ ছিলেন বলে জানা গেছে।

জনাব খামেনিকে এখন তার দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর করার জন্য নির্ভরযোগ্য অন্য কাউকে খুঁজে বের করতে হবে এবং তার উত্তরসূরি নির্ধারণ করার জন্য আরেকটি কল্পিত নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এটি মোটেও সহজ হবে না। প্রজাতন্ত্রের সৃষ্টির সময় ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আগের তুলনায় এতটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে যে, পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থার খুব কমই মিল রয়েছে।

যেহেতু জনাব খামেনিকে অবশ্যই বিপ্লবের মূল্যবোধ বজায় রাখতে এবং ধর্মতন্ত্রকে অক্ষুণ্ন রাখতে এই নতুন গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে হবে, তাই তাকে তাদের সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় নিতে হবে, কারণ পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন এবং কে তার স্থলাভিষিক্ত সর্বোচ্চ নেতা  হবেন, সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব তার ওপরই বর্তাবে।

এই নতুন দলটিকে বিভিন্ন জনপ্রিয় বিদ্রোহের সঙ্গে লড়াই করে এই পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এই দলের অনেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রেভ্যুলুশনারি গার্ডে কাজ করেছেন। কট্টরপন্থি পেদারি পার্টির প্রতি তাদের শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে, যেটি এখন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই দলের সবচেয়ে সোচ্চার সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মোর্তেজা আকা তেহরানি, দলের অন্যতম নেতা এবং ইব্রাহিম রাইসি সরকারের সড়ক ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী মেহরদাদ বজরপাশ। তারা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাবেক পারমাণবিক নেগোশিয়েটর সাইদ জালিলিকে সমর্থন করেন, যিনি প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছিলেন।

ইরানের সীমানার বাইরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে জনাব রাইসির কিছু বলার ছিল না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে অবশ্য তার কোনো মাথাব্যথাও ছিল না, যদিও তিনি ইসরাইলের সঙ্গে খামেনি শাসনের সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু জনাব খামেনির তরুণ শিষ্যদেরও এখন বয়স হয়েছে, কারণ তারা অনেক দিন ধরে দেখে আসছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। তারা বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে শক্তিশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চীনা ও রাশিয়ান জোটকে স্বাগত জানিয়েছে।

রাইসির মৃত্যুর প্রেক্ষিতে এই তরুণ প্রজন্মের কর্মকাণ্ড ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ ও পরীক্ষা করার ব্যাপারে খামেনির সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ প্রজন্মকে পারমাণবিক শক্তি অর্জনের জন্য আরো বেশি উত্সাহিত করে তুলবে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি করতে বহুজাতিক প্রক্সি বাহিনীকে সামরিক সহযোগিতা করার প্রচেষ্টা প্রায় নিশ্চিতভাবেই অপরিবর্তিত থাকবে, কারণ এই অঞ্চলে ইসরাইলের একচ্ছত্র আধিপত্য দমনে প্রক্সি বাহিনীর সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর কারণে জনাব খামেনির উত্তরাধিকার কে হবেন, তা এখন প্রজাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করছে। লোকমুখে গুঞ্জন উঠেছে যে, তার ছেলে মোজতবা পিতার পদ গ্রহণ করতে পারেন। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এই পদের জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে ক্যারিশম্যাটিক কর্তৃত্ব ও ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রতি গুরুত্ব দিতে পারে। তবে তারা রাজবংশীয় উত্তরাধিকারের পক্ষে নন। যাকে এখনো পারস্যের রাজতন্ত্র হিসেবে দেখা হয়, যেটা সেই ১৯৭৯ সালেই বিলুপ্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খামেনিপুত্র অন্য কোনো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, তবে পিতার পদে তার আনুষ্ঠানিক পদোন্নতিকে ইরানের অনেক নেতা ভালো চোখে দেখবেন না। তার মানে এই পদের জন্য আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামির মতো কট্টরপন্থি ধর্মগুরুকে বিবেচনা করা হতে পারে, যিনি বর্তমানে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য।

যদি সত্যিই এমন ঘটে, তাহলে তা ইরানের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য মোটেও ভালো সংবাদ নয়। ক্ষমতা গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে থাকা প্রজন্ম দেশীয় নিপীড়ন এবং বিদেশি আগ্রাসনকে বিপ্লবের সাফল্যের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে। তারা রাইসির প্রজন্মের তুলনায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আরো বেশি ক্ষুব্ধ এবং সব ধরনের ভিন্নমতকে প্রজাতন্ত্র ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে, অর্থাত্ রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল মনে করে। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু ইরানের নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের পথ সুগম করে দিলেও ইরানের জনগণ ও স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য এটা একটা দুঃসংবাদ।

লেখকদ্বয়: ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসি ও ফরেন রিলেশনস কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা

নিউ ইউর্ক টাইমস থেকে অনুবাদ :আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইত্তেফাক/এমএএম