শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনটাই হইল বড় নাটক

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০২:১০

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচন লইয়া কেলেঙ্কারির অভাব নাই। জাতীয় বা স্থানীয় যেই নির্বাচন হউক না কেন, এমন সকল কাণ্ডকারখানা ঘটে, যাহা দেখিয়া আক্কেলগুড়ুম হইয়া যাইতে হয়। বিশেষ করিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশে নির্বাচনি সংস্কৃতি বলিবার মতো নহে। আবার এই অঞ্চলের এমন সকল জনপদ রহিয়াছে, যেইখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া ছয় মাস এমনকি এক বত্সর পূর্ব হইতেই যেই সকল কীর্তিকলাপ ঘটে তাহা দেখিয়া তাজ্জব বনিয়া যাইতে হয়। বিরোধী দল এমনকি নিজ দলের সমর্থক প্রতিপক্ষ কেহ প্রার্থী হইতে চাহিলে তাহার ও তাহার অনুসারীদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমাদিয়া নির্বাচনি মাঠ হইতেই তাহাদের মাইনাস করিবার চেষ্টা চলে। মামলা-হামলার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, তাহারা নিজ বাড়ি ও এলাকায় থাকিতে পারেন না। কেহ যদি সৌভাগ্যক্রমে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, তাহা হইলে প্রচার-প্রচারণাকালে তাহার নির্বাচনি ক্যাম্প, ব্যবসায়-বাণিজ্যকেন্দ্র এমনকি বাড়িঘর পর্যন্ত ভাঙচুর করা হয়। তাহার পরও যদি কেহ টিকিয়া যান, তাহা হইলে নির্বাচনের দিন চলে আসল লড়াই। হাতাহাতি, মারামারি এমনকি খুনাখুনিও হইয়া থাকে। ইহাতে নারী প্রার্থী কিংবা সমর্থকরাও কম যান না। টিভির সম্মুখে নির্বাচনের লাইভ প্রোগ্রাম দেখিতে বসিলে নাটক-সিনেমা দেখিবার আর খায়েশ বা ইচ্ছা কোনোটাই থাকিবে না। কেননা উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনটাই হইল বড় নাটক।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এই সকল দেশে পেশিশক্তি ও অস্ত্র প্রদর্শনের চিত্র যেমন আছে, তেমনি আছে সূক্ষ্ম হইতে অতি সূক্ষ্ম কূটচালের বিষয়টিও। জাল-জালিয়াতি করিতেও তো বুদ্ধি লাগে! নির্বাচনের পূর্বের রাত্রিতে ভোটকেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরা উধাও হইয়া যায়। অভিযোগ দেওয়ার পরও কিচ্ছু হয় না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যেইভাবে কালোটাকার ছড়াছড়ি চলে, তাহাও এক গুরুতর নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন। যাহারা অভিযোগ করেন, উলটা তাহাদের হয়রানির মধ্যে পড়িতে হয়। নির্বাচনের দিন প্রতিপক্ষ প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্র হইতে বাহির করিয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমনকি ব্যালট বক্সও ছিনতাই হইয়া যায়। খুঁজিতে খুঁজিতে তাহা পাওয়া যায় কোনো পুকুরে নয়তো বন-জঙ্গলে। ইহাতে প্রশ্ন উঠে, এই গণতন্ত্র কীসের ও কাহাদের জন্য?

আমরা বলি, গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। ইহাকে বাংলা করিয়া বুঝানো কঠিন। উন্নত বিশ্ব ইহার মর্যাদা বুঝিতে পারিয়াছে বলিয়াই তাহারা আজ এতটা উন্নত ও সভ্য; কিন্তু যেই সকল দেশের গণতন্ত্র নবীন বা বহু বত্সরের ঐতিহ্যহীন, সেই সকল দেশে রাতারাতি পরিবর্তন হওয়াটা সহজ নহে। ইরানের সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পশ্চিমাদের বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন যে, গোত্রতান্ত্রিক দেশ গণতান্ত্রিক হইতে পারে না। যেই সকল দেশে রাজতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস রহিয়াছে, সেই সকল দেশে গতানুগতিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইলেও শাসকরা নিজেদের এখনো রাজাই মনে করেন। রাজনৈতিক নেতা ও আমলারা রাজা বা জমিদারের মতো আচরণ করেন। বিশেষ করিয়া আমলাতন্ত্র যখন নিরপেক্ষ নীতি বিসর্জন দিয়া রাজনৈতিক দলের সহিত মিলিয়া-মিশিয়া নানা অন্যায়-অপকর্ম ও কুকীর্তি চালাইয়া যায়, তখন সেই সকল দেশকে কি গণতন্ত্রী দেশ বলিয়া স্বীকৃতি দেওয়া যায়?

একসময় পৃথিবী ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রী পুঁজিবাদী ব্লক; কিন্তু এখন অনেকেই মনে করেন, এই দুই নীতিরই বিকৃতিসাধন ঘটিয়াছে। সিনথেসিসের মাধ্যমে একপ্রকার মিশ্রনীতি অবলম্বনের পক্ষপাতী অনেকে। তবে সহজ কথায় গণতন্ত্র বলিতে আমরা বুঝি মুক্তচিন্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন, ভোটাধিকার ইত্যাদি। প্রাচীন অ্যাথেন্সে প্রায় ৪০৮ খ্রিষ্টপূর্বে সরকারের রূপ হিসাবে গণতন্ত্র ও সংবিধানের ধারণার জন্ম নেয়। এখানকার সিটি স্টেট বা নগররাজ্যগুলিতে গণতন্ত্রের পাশাপাশি ছিল অভিজাততন্ত্র, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি শাসনব্যবস্থাও। আজ তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্র কার্যকর না হওয়ার অন্যতম কারণ মৌলিক বা মানসম্মত শিক্ষার অভাব ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সামান্য অর্থ এমনকি একটি টিউবওয়েলের বিনিময়ে তাহার ভোট বিক্রয় করিয়া দেন। এমন নাগরিকদের দিয়া গণতন্ত্র কীভাবে ফলপ্রসূ হইবে? এই কারণেই এই সকল দেশে দেখা দিতেছে গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রহীনতা বা বিকল গণতন্ত্র। তাহারই বহিঃপ্রকাশ হইল আজিব নির্বাচনি ব্যবস্থা!

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন