শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শতবর্ষেও তাহার ‘উন্নত মম শির’

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০৪:০০

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এই দিনে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। তাহার বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। অথচ মেধা ও প্রতিভাগুণে তিনিই একসময় হইয়া উঠেন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাহার সাহিত্যসাধনা আজও বাঙালি চিন্তাচেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হইয়া রহিয়াছে।

কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এক শতাব্দীরও অধিক কাল পরও তিনি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের মানস তৈরিতে রহিয়াছেন মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। তাহার কবিতা ও গান আজও মানুষের হূদয় স্পর্শ করিয়া যায়। তাহার বিদ্রোহী সত্তা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। আজও যখন নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশে তাহার বিদ্রোহী কবিতার কিয়দংশ পাঠ করেন, তখন সাধারণ কর্মীরা উজ্জীবিত হন। তিনি লিখিয়াছেন : ‘কারার ঐ লৌহকপাট, /ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট, /রক্তজমাট /শিকল পূজার পাষাণ-বেদী। /ওরে ও তরুণ ঈশান! /বাজা তোর প্রলয় বিষাণ! /ধ্বংস নিশান /উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’। এই ধরনের নানা টগবগে কবিতা-গান যুগে যুগে অত্যাচারিত, উত্পীড়িত ও অসহায় মানুষকে উজ্জীবিত করিয়া আসিতেছে। অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করিতে হইলেও কাজী নজরুল ইসলামকে আমাদের প্রয়োজন। তাই তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক এবং তাহার প্রাসঙ্গিকতা কখনোই ফুরাইয়া যাইবার নহে। দেশে দেশে মজলুম মানুষের জন্য তিনি এক আদর্শ মূর্তপ্রতীক। এই জন্য তিনি মানুষের হূদয়ে চিরজাগরুক হইয়া থাকিবেন।

কাজী নজরুল ইসলাম যে শুধু বিদ্রোহী কবি ছিলেন, তাহা নহে। ইহার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন রোমান্টিক কবিও। প্রেম ও ভালোবাসা লইয়া তাহার শত শত গান ও কবিতা রহিয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন :‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল /কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল’। তিনি ছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির ধারক-বাহক ছিলেন তিনি। এই কারণে তিনি হামদ-নাত-গজল যেমন লিখিয়াছেন, তেমনি ইহার পাশাপাশি লিখিয়াছেন শ্যামাসংগীত ও বৈষ্ণবপদ। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের শাসনামলে এই দেশের ভাষা ও সাহিত্য সমাদৃত হয়। হিন্দু-মুসলিম দেশীয় কবি-সাহিত্যিকরা পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। সেই সমন্বয়বাদীর চিন্তাধারার আলোকে শ্রীচৈতন্যের ভক্তিবাদ ও মুসলমান সুফিসাধকদের মানবতবাদী দর্শন—এই দুইয়ের সংমিশ্রণে এক অসামান্য সাহিত্য-সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে নজরুলের শক্তিশালী কলমের ছোঁয়ায়।

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন সংগ্রামী কবি। তাহার অপর নাম দুখু মিয়া। দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করিয়া তিনি দারিদ্র্যকে দান করিয়াছেন খ্রিষ্টের সম্মান। ছোটকালে পিতৃহীন এই ছেলেটিকে মসজিদে মোয়াজ্জিন ও মক্তবে শিক্ষতার চাকুরি করিতে হইলেও তিনি একসময় যাত্রাগান লেটোগানের আসরে যোগদান করেন। ইহা হইতেই তাহার কবিপ্রতিভা বিচ্ছুরিত হইতে শুরু করে। তাহার রুটির দোকানে কাজ করা কিংবা সৈনিক হিসাবে অভিজ্ঞতা লাভ—উভয়ই তাহার বিদ্রোহী মানস গঠনে সহায়তা করিয়াছে। সবচাইতে বড় ব্যাপার হইল, কাজী পরিবার মোগল আমলে ছিল বিচারক, অভিজাত এবং মানমর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী; কিন্তু ইংরেজরা এতদঞ্চলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইলে কাজীদের জীবন-জীবিকা যেমন হুমকির মধ্যে পড়ে, তেমনি মানমর্যাদায়ও বড় রকমের আঘাত আসে। এই ক্ষয়িষ্ণু পরিবারেই বাংলা সাহিত্যের একজন দিকপালের জন্মগ্রহণ করাটা কি বিস্ময়কর নহে?

কাজী নজরুল ইসলামের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সকল নজরুলভক্ত ও গবেষকের প্রতি আমরা জানাই শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। নজরুলের সাম্য, শান্তি, প্রেম ও দ্রোহের বাণী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া বিশ্বের তাবত্ মানুষকে অনুপ্রাণিত করুক, ইহাই আমরা কামনা করি। অনুবাদের মাধ্যমে নজরুলসাহিত্য ও তাহার মর্মবাণীকে এখন ছড়াইয়া দিতে হইবে বিশ্বব্যাপী। দেশে-বিদেশে নজরুলচর্চা আরো বাড়িলে আমাদের আজিকার জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন সুন্দর ও সার্থক হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন