আদিবাসীদের বর্ষা উত্সব

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৯, ১৮:০৩

মেহেদী হাসান গালিব

 

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে প্রকৃতি যখন রুক্ষ্ম ও শুষ্ক বেশ ধারণ করে তখন আশীর্বাদরূপে প্রকৃতির কাছে ধরা দেয় বর্ষা। বর্ষার স্নিগ্ধ শীতল বৃষ্টিকণায় প্রকৃতি আবার সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠে। বর্ষা সিক্ত প্রকৃতির এই প্রাণবন্ত রূপ যেন সকল সৌন্দর্য পিয়াসীদের নজর কেড়ে নেয়, হূদয়ে বইয়ে দেয় আনন্দের দোলা! বর্ষা বাঙালি হূদয়ে যে আবেদন সৃষ্টি করে তা আর অন্য কোনো ঋতুর পক্ষে সম্ভব হয় না। রুক্ষ্ম প্রকৃতি ও মানব মনকে শীতল বৃষ্টিকণায় ছুঁইয়ে দিতেই বর্ষা যেন আমাদের মাঝে আশীর্বাদ হয়ে আসে। পল্লী গ্রামের কৃষকদের কপালে রুক্ষ্ম ও চৌচির ক্ষেতের চিন্তায় যে ভাঁজ পড়ে বর্ষা নিমিষেই তা মিলিয়ে দেয় আনন্দের ঝর্ণাধারায়। অঝোর বর্ষণে মাঠ-ঘাট, নদী-নালা পানিতে ভরে ওঠে। ঝিমিয়ে পড়া কৃষকরা দ্বিগুণ উত্সাহে কাজে নেমে পড়ে। তাদের রগ ফুলে ওঠা হাতের প্রতিটি শিরায় শিরায় খেলা করে কর্ম চঞ্চলতা। আর তাই বর্ষার এই আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা পালন করি বর্ষা উত্সব। শহরের মানুষরা বর্ষা উত্সবে তেমন একটা প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান না। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপনের মাধ্যমেই তাদের বর্ষা পালিত হয়। কিন্তু নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠির মানুষদের বর্ষা উত্সব পালন করা ধরণ একটু ভিন্নরকম। তারা প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে মহা-সমারোহে পালন করে বর্ষা উত্সব। নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠির সিংহভাগই পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করায় তারা একেবারে কাছ থেকে বর্ষাকে উপভোগ করার সুযোগ পায়। আর তাই তো বর্ষা তাদের কাছে একইসাথে সৌন্দর্যের বাহক ও অনাবিল আনন্দের উত্স। বর্ষাকে বরণ করতে তারা আষাঢ় মাসের প্রথম দিন থেকে বর্ষা উত্সব পালন করা শুরু করে থাকেন। বৌদ্ধ ধর্মের রীতি অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বর্ষা বাস। খাবারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংযমের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বর্ষা বাস করা হয়। বর্ষা বাসের আগে প্রস্তুতিমূলক একটি অংশের নামই হলো বর্ষা উত্সব। বর্ষা উত্সবে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভোজ, পান ও নাচ-গানের মাধ্যমে আনন্দ উল্লাস করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনরা বিভিন্ন উত্সব অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বেশ আবেগী। বর্ষা উত্সবের সাথে তাদের পরিচিতি খুব বেশিদিনের না হলেও তারা বেশ উত্সাহ ও উদ্দীপনার সাথে পুরো তিন মাসব্যাপী বর্ষা উত্সব পালন করে থাকেন। এই তিন মাসের প্রতি শুক্রবার রাখাইনরা কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবাগানে বৃষ্টিতে ভিজে বর্ষা উত্সব পালন করেন। উত্সব চলাকালীন তারা বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসেন। এ সময় তারা নিজস্ব তৈরি পানীয় ‘প্রায়ইং’ও সঙ্গে রাখেন। বর্ষা উত্সবে সবাই পরিবার পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব মিলে সমুদ্র স্নান করে ও গল্প-গুজব করে অত্যন্ত আনন্দঘন কিছু সময় কাটান। শুধুমাত্র কক্সবাজারের রাখাইনরাই নয়, বর্ষা উত্সবে যোগ দিতে সমুদ্রসৈকতে আসেন টেকনাফ, চকরিয়া, হারবাং, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও মহেশখালীর রাখাইনরা। তাদের এই উত্সব দেখতে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে ভিড় জমান। মাত্র আট বছর আগে শুরু হওয়া এই উত্সব সময়ের সাথে সাথে বেশ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মারমাদের কাছে বর্ষা উত্সব যেন এক ধরনের বনভোজন ও মিলনমেলা। এই উত্সবকে কেন্দ্র করেই সুযোগ মেলে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা করার। হাসি-ঠাট্টা ও গল্প-গুজবের মাধ্যমে সবাই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। রাখাইন ও মারমাদের মতো চাকমা ও মুণ্ডা উপজাতির জনগোষ্ঠিরাও বেশ উত্সাহ ও উদ্দীপনার সাথে বর্ষা উত্সব পালন করে থাকেন। বৃষ্টিতে ভিজে তিন মাসব্যাপী বর্ষা উত্সব পালনই বলে দেয় যে, আদিবাসীরা প্রকৃতির সাথে নিজেদের সত্তাকে কতটা অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে রেখেছে। এ উত্সব শুধু একটি আনন্দঘন সময়ের সমষ্টি নয়, এ উত্সব তারুণ্যের উচ্ছ্বসিত একটি সংস্কৃতি। তরুণ-তরুণীদের সদ্য প্রস্ফুটিত কোমল মনে বর্ষা উত্সব যেন এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। বর্ষা উত্সব তাদের প্রাণের কথা বলে, বলে তাদের আবেগ ও অনুভূতির কথা!