শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না

আপডেট : ২৭ মে ২০২৪, ০৫:৩০

আমরা যাহা করি, তাহা কতটা বুঝিয়া করি? এই ব্যাপারে আমরা আসলে কতটা সচেতন? এই কথা সত্য যে, বুঝিয়া না করিবার ফল কখনোই শুভ হয় না। এমনকি আমরা ধ্বংস হইয়া যাইতে পারি, যদি আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না বুঝিয়া করি। নিজেদের মধ্যে বা বিভিন্ন দলের মধ্যে যে ঐক্য হয়, তাহার একটি অভিন্ন স্বার্থ ও উদ্দেশ্য থাকে। ঐক্যবদ্ধ থাকিলে সেই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাইতে পারি সহজেই; কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল হয় মারাত্মক। ইহার কারণে আমরা ধ্বংস বা নিঃশেষ হইয়া যাইতে পারি।

কার্ল মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ তথ্যে এই বিষয়টি উঠিয়া আসিয়াছে। ইংরেজিতে যাহাকে বলা হয় Dialectical Materialism। Dialectical শব্দটি আসিয়াছে গ্রিক Dialego শব্দ হইতে, যাহার অর্থ আলোচনা বা তর্ক করা। ইহাকে মার্কসবাদের ভিত্তিমূল বলিয়া গণ্য করা হয়। জার্মান দার্শনিক হেগেল এই তত্ত্বের জনক হইলেও কার্লমার্কসের মাধ্যমে ইহা বিকাশ লাভ করিয়াছে।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের দ্বিতীয় সূত্র হইল, প্রতিটি বস্তুর মধ্যে পরস্পরবিরোধী প্রবণতা বা বৈপরীত্য থাকে। এই পরস্পরবিরোধী প্রবণতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত বস্তুর পরিবর্তন ঘটায়। সমাজব্যবস্থার মধ্যেও অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব থাকে। যেমন—সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাসদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বের ফলে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান হইয়াছে এবং উদ্ভব হইয়াছে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভাবিতে হইবে যে, রাজনীতির ক্ষেত্রে যাহারা জোটবদ্ধ হন, তাহাদের সকলের সমান শক্তি নাই। সমান শক্তি থাকিবার কথাও নহে। তাহার পরও তাহারা কেন ঐক্যবদ্ধ হন? কারণ দুর্বল তুলনামূলক সবলের সঙ্গে মিলিয়া গেলে আরেকটি শক্তি সৃষ্টি হয়। সেটা হয় নাই বহু দেশে। ফলে এই যূথবদ্ধতার অভাবই তাহাদের পতনের কারণ হইয়া দাঁড়ায়। এই জন্য আমরা বলি—যাহা কিছু আমরা করিব তাহা যেন বুঝিয়া শুনিয়া করি। না বুঝিয়া করিলে তাহাতে হিতে বিপরীত হয়। আর বুঝিয়া করিলে তাহাতে কেহ বোকা ভাবিলেও কিছু যায় আসে না।

আমরা সমবেত হইলাম ধর্মান্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে। যেইহেতু তখন অন্যরা আসে নাই, তাই আমরা দাঁড়াইয়া গেলাম সেই ভিন্নশক্তির বিরুদ্ধে; কিন্তু এখন আমরা কী দেখিতে পাইতেছি? যাহাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করিলাম, তাহাদের উত্তরসূরিরা ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করিয়া আমাদের চোখ রাঙায়। এমনকি তাহাদের হামলা-মামলার কারণে নিজ ঘরে বা এলাকায় টিকিয়া থাকা আজ কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। যাহাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হইয়াছিলাম, তাহাদের নিকট আমরা কীভাবে পরাজিত হইতে পারি? তাহাদের বাড়াবাড়ির কারণে  কোনো কোনো ঐক্যবদ্ধ ছোট ছোট দল এখন বিলুপ্ত প্রায়। তাহা হইলে আমাদের বোধোদয় হইবে কবে?

বুর্জোয়াদের অনেক ভালো গুণ রহিয়াছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাহাদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য; কিন্তু তাহাদেরও আদর্শ নাই বলিলেই চলে। তাহাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে—যেভাবেই হউক অঢেল অর্থসম্পদের মালিক হওয়া। ফলে তাহারা নীতি-আদর্শের মাথা খাইয়া অবলীলায় তাহাদের পক্ষেও চলিয়া যাইতে কার্পণ্যবোধ করেন না, যাহাদের বিরুদ্ধে তাহারা একদা ঐক্যের আহ্বান জানাইয়াছিলেন। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, জোট ক্ষমতায় থাকিলেও স্থানীয় প্রশাসন আবার ঐ বিরুদ্ধশক্তির নির্দেশেই চলে। ইহা কী করিয়া সম্ভব? আমরা ধরিয়া লইলাম—সরকার নিরপেক্ষ রহিয়াছে; কিন্তু সরকারের প্রশাসন কি নিরপেক্ষ রহিয়াছে?

পৃথিবীর এখানে সেখানে ঐক্য হয়; কিন্তু যখন নিজেরাই সেই ঐক্যের বিরুদ্ধে কাজ করেন, তখন সেই ঐক্য পরাজিত হয়। তখন জয়লাভ করে তাহারাই, যাহাদের বিরুদ্ধে একদা ঐক্য স্থাপন করা হইয়াছিল। অতএব, সাধু সাবধান। ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন