মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

রেমালে ক্ষতিগ্রস্তদের পার্শ্বে দাঁড়াইতে হইবে

আপডেট : ২৯ মে ২০২৪, ০৪:৩০

প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল আমাদের জন্য কতটা ক্ষত সৃষ্টি করিয়াছে তাহা আমরা এখন সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিতেছি। প্রায় দ্বিতল ভবনের সমান উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হইয়াছে বহু জনপদ ও ফসলের খেত। জলোচ্ছ্বাসে টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টা পানিতে নিমজ্জিত ছিল সুন্দরবন। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা যেমন এখনো যত্রতত্র উপড়াইয়া পড়িয়া রহিয়াছে, তেমনি অনেক বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রেও ঘটিয়াছে মর্মান্তিক মৃত্যু ও বিপর্যয়ের ঘটনা। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হইয়াছে, কেবল সরকারি হিসাবেই রেমালের আঘাতে সাত জেলায় মৃত্যুবরণ করিয়াছে ১৪ জন। ইহাতে প্রায় দেড় লক্ষ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হইয়াছে। ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে সাড়ে ৩৭ লক্ষ মানুষ। ভাসিয়া গিয়াছে অর্ধলক্ষাধিক মাছের ঘের। পৌনে ৩ কোটি গ্রাহক বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন হইয়াছেন। ১৫ হাজার মোবাইল ফোনের টাওয়ার নিষ্ক্রিয় রহিয়াছে। ৬১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। এইভাবে দেখা যাইতেছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম নহে।

রেমাল চলিয়া যাইবার পর বিভিন্ন জনপদের বিধ্বস্ত রূপ ও প্রকৃত চিত্র দেখিয়া আমরা বিমূঢ় ও মর্মাহত। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা হইতে একের পর এক হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যাইতেছে। অনেক অসুস্থ প্রাণীকে চিকিত্সা দেওয়া হইতেছে। সমাজ ও উদ্ধারকর্মীদের এখন ব্যস্ততা বাড়িয়া গিয়াছে। মানুষ, গৃহপালিত জন্তু, পশুপাখি ও বন্যপ্রাণী যে যেখানেই বিপদে ও বিপন্ন অবস্থায় রহিয়াছে, তাহাদের উদ্ধারপূর্বক চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে একজন মত্স্যচাষি আফসোস করিয়া বলিয়াছেন, ‘ক্ষতির কথা শুনে কী করবা, সব তো শেষ।’ তাহার এই কথার মধ্যেও রেমাল ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা কিছুটা হইলেও আঁচ করা যায়। ঘের ভাসিয়া যাওয়ায় তাহার মতো শত শত মত্স্যচাষি পড়িয়াছেন বিপাকে। এই ঘূর্ণিঝড় অনেককে পথে বসাইয়া দিয়াছে। তাহারা যাহাতে আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারেন, সেই দিকে এখন দৃষ্টি দিতে হইবে। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট মেরামত এবং বাঁধ পুনর্নির্মাণসহ নানা উদ্যোগ নিতে হইবে বা তাহাতে সাহায্য-সহযোগিতা করিতে হইবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় পৃথিবী জুড়িয়া আমাদের সুনাম ও  সাফল্যগাথা রহিয়াছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রোলমডেল বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এইবারও সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের কারণে মানুষ সময়মতো সাইক্লোন শেল্টারে  আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে জীবনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গিয়াছে। তবে কোথাও কোথাও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা যাইতেছে না। এই জন্য প্রয়োজনে হেলিকপটার হইতে ত্রাণসামগ্রী ফেলিতে হইবে সুনির্দিষ্ট এলাকায়। শুধু বাংলাদেশ নহে, ঘূর্ণিঝড় রেমেলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও ব্যাপক ক্ষতি হইয়াছে। সেখানে মৃত্যু হইয়াছে ছয় জনের। আমরা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। এই বিপর্যয় যাহাতে আমরা খুব শিগিগরই কাটাইয়া উঠিতে পারি, এই জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী ষাটের দশকে বাংলাদেশে উপকূল এলাকায় ২৪টি সাইক্লোন আঘাত হানিয়াছিল। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তাহা কমিয়া দাঁড়ায় ১৩টি। দেখা যাইতেছে, সংখ্যায় কমিলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি কমিতেছে না। যদিও জীবনহানি কমিতেছে। যেমন, ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এই দেশে মারা যায় যথাক্রমে ৫ লক্ষ ও ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষ। তবে পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে সিডরে মারা যায় ৩ হাজার জন। আমরা সাইক্লোন প্রতিরোধ করিতে পারি না। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আরো উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা এই ক্ষয়ক্ষতিও যথাসম্ভব কমাইয়া আনিতে পারি।

এখন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজগুলি সম্পন্ন করিতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্তদের পার্শ্বে দল-মতনির্বিশেষে সকলকে দাঁড়াইতে হইবে। এই সময় আমাদের উচিত আশ্রয়কেন্দ্র হইতে মানুষকে বাড়িতে ফিরাইয়া আনিতে সাহায্য করা, তাহাদের যথাসম্ভব মাথা গুঁজিবার ঠাঁই করিয়া দেওয়া, ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় ঔষধসামগ্রী বিতরণ করা, বৃষ্টির পানি ধরিয়া রাখিবার ব্যবস্থা করা, দ্রুত উত্পাদনশীল ধান ও শাকসবজির জন্য জমি প্রস্তুত করিতে কৃষকদের সাহায্য করা ইত্যাদি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন