বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ইহাই গণতন্ত্র, ইহাই গণতন্ত্রের অপার সৌন্দর্য

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪, ০৪:১৫

একটি দেশের গণতন্ত্র কতখানি স্বাভাবিক, তাহার অন্যতম বড় মাপকাঠি হইল—ক্ষমতার পালবদল। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই গণতন্ত্র রহিয়াছে বটে; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল যেন অনেক দেশেই ভয়ংকর এক ঘূর্ণিপাক। রেমাল, আমফান, ফণী, সিডর, আইলার মতোই ক্ষমতার পালাবদলের সময় অনেক দেশেই বিপুল ও ব্যাপক ঘূর্ণিপাক তৈরি হয়; কিন্তু আমাদের সম্মুখে তৃতীয় বিশ্বের অন্তত এমন একটি দেশের উদাহরণ রহিয়াছে, যেইখানে ক্ষমতার উত্থানপতন যেন বিস্ময়কর শিক্ষা দেয় তৃতীয় বিশ্বের অন্য সকল দেশকে। দেশটির নাম ভারত। গতকাল প্রকাশিত ভারতের ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের সর্বশেষ ফলাফল বলিয়া দেয় গণতন্ত্র কী জিনিস! ভারতে এই লোকসভা নির্বাচন শুরু হইয়াছিল গত ১৯ এপ্রিল। সাত দফা ভোট শেষে নির্বাচন সম্পন্ন হইল গত পহেলা জুন; এবং ভোট গণনা হইল গতকাল ৪ জুন। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, ভোটের প্রচারণার সময় প্রতিপক্ষকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ, মারামারি-সহিসংতা সেইখানে ব্যাপকভাবেই ঘটে। বিশেষ করিয়া বাংলাদেশের নিকটতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটের হিংসার ছবি দেখিয়া যে কেহ আতঙ্কিত হইবেন; এবং ভোটের পরও সেইখানে হিংসা থামিয়া নাই। পশ্চিমবঙ্গ বাদ দিলে বাকি ভারতের ভোট-হিংসা প্রায় নাই বলিলেই চলে; কিন্তু ভারতের জন্য যাহা সবচাইতে বড় ম্যাজিক, তাহা হইল—ভোটের ফলাফল মাথা পাতিয়া লওয়া। যখনই ভোট শেষ হইল, ঘোষিত হইল ফলাফল, তখন পরাজিত দল, তাহারা ক্ষমতায় থাকিলেও, সদ্যবিজয়ী দলকে ‘শুভেচ্ছা’-‘অভিনন্দন’ জানাইতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। গণতন্ত্রের জন্য ইহা এক অপূর্ব সুন্দর উদাহরণ। গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশটির নির্বাচন কমিশন জানাইয়াছে, প্রায় ৬৪.২ কোটি মানুষ এই লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়াছে। বিশ্বের সর্ববৃহত্ এই নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ৬৮ হাজারের অধিক মনিটরিং দল, দেড় কোটি ভোটার ও নিরাপত্তাকর্মী অংশ লইয়াছে। ভোট পরিচালনায় প্রায় ৪ লক্ষ গাড়ি, ১৩৫টি বিশেষ ট্রেন ও ১ হাজার ৬৯২টি এয়ার শর্টিস (Air Sorties) ব্যবহার করা হইয়াছে। বলা যায়, বহু ধর্মবর্ণ-বিভক্ত ভারতকে একসূত্রে গাঁথিয়াছে এই গণতন্ত্রই। প্রায় দেড় মাস ধরিয়া প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই প্রতিটি দল শত শত জনসভা করিয়াছে। ভোটারদের মন জয় করিতে তাহারা চেষ্টার কোনো কার্পণ্য রাখে নাই। প্রকৃত অর্থে, দেশটির বিচিত্র ভৌগোলিক পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করাও কঠিন চ্যালেঞ্জসমূহের একটি বলা যায়। কোথাও গভীর অরণ্যে একজন মাত্র ভোটারের জন্যও ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করিতে হয় বইকি (যেমন—গুজরাটের ‘গির’)। আবার অরুণাচল প্রদেশের সুউচ্চ পাহাড়ি জনপদে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের হয়তো চার দিন ধরিয়া বরফাবৃত পথ পাড়ি দিয়া পৌঁছাইতে হয় হাতে গোনা কয়েক জনের ভোট লইবার জন্য। এইভাবে মরুভূমি, জলাভূমি, শ্বাপদসংকুল অরণ্য—সকল জায়গায় ‘গণতন্ত্র’ তাহার ন্যূনতম ছায়া রাখিয়া যায়। ভারত ক্রমশ একতাবদ্ধ ও বৃহত্শক্তি হইতেছে এই গণতান্ত্রিক শক্তির বলে বলিয়ান হইয়াই। একটি দেশকে গণতন্ত্র কী পারে—উন্নয়নশীল কোনো দেশের জন্য ভারতের মতো সর্বাধিক সুন্দর উদাহরণ আর কী আছে? 

ইতিমধ্যেই আমরা ফলাফল জানিয়াছি। বর্তমানে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২০১৯ সালের তুলনায় যথেষ্ট খারাপ রেজাল্ট করিয়াছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশ্য ভোটের প্রচারে বারংবার বলিয়াছেন—‘আগলিবার ৪০০ পার’। অর্থাত্ এইবার তাহারা চার শতাধিক আসনে জয় পাইবেন। বাস্তবে বলা যায় এনডিএ জোটের ফল-বিপর্যয় ঘটিয়াছে। তাহারা কোনোক্রমে তিন শতের কাছাকাছি আসন পাইয়াছে। এনডিএ জোটের বিপরীতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ফলাফল চমকপ্রদ। ৮০টি আসনের উত্তরপ্রদেশ ছিল বিজেপির ঘাঁটি, সেইখানে বিরাট বিপর্যয় ঘটিয়াছে। পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির ফলাফল তৃণমূল কংগ্রেসের তুলনায় যথেষ্ট খারাপ। যদিও এককভাবে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করিতে পারে নাই। তবে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ২৭২টি তাহাদের এনডিএ জোটই অর্জন করিতেছে। স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী বিরোধী দলের মধ্যে নরেন্দ্র মোদি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হইতে যাইতেছেন। নরেন্দ্র মোদির জন্য অভিনন্দন রহিল। অভিনন্দন রহিল ভারতের গণতন্ত্রের জন্য।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন