বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নদী রক্ষা না করিলে টিকসই উন্নয়ন হইবে না

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৪, ০৭:৩০

নদীকে এখন জীবন্ত সত্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নদীমাতৃক দেশে নদী নষ্ট হইলে জীবন-জীবিকাও নষ্ট হয়। এবং তাহাই ঘটিতেছে বহু বত্সর ধরিয়া। ইহা লইয়া অসংখ্য প্রতিবেদন-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হইয়াছে। সরকারও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ লইয়াছে। ঢাকার নদীদূষণ রোধ করিতে পাঁচ বত্সর পূর্বে হাজারীবাগ হইতে ট্যানারি সরাইয়া সাভারের হেমায়েতপুরে নেওয়া হইয়াছে। শিল্পকারখানাগুলির ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) সংস্কারের ব্যবস্থা লওয়া হইয়াছে বিভিন্ন সময়; কিন্তু যতখানি সংস্কার করা হয়, তাহার চাইতে অধিক দূূষিত পদার্থ প্রবেশ করিলে নদীগুলি ভালো হইয়া উঠিবে কী করিয়া? সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, বিশ্বের পঞ্চম দূষিত নদী হইল আমাদের বুড়িগঙ্গা। এই নদীতে দিনে ৯০ টন বর্জ্য ফেলা হইতেছে। তুলনামূলক বিবেচনায় বিশ্বের সবচাইতে দূষিত নদী ইন্দোনেশিয়ার চিতারুমের চাইতেও অধিক দূষিত হইতেছে বুড়িগঙ্গা। ইন্দোনেশিয়ার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চিতারুম নদীকে বিশ্বব্যাংক বিশ্বের সবচাইতে দূষিত নদী হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে। এই নদীতে দিনে ২৮০ টন বর্জ্য ফেলা হয়। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে দিনে ৯০ টন বর্জ্য ফেলা হয়। তবে বুড়িগঙ্গা মাত্র ৪৫ কিলামিটার দীর্ঘ। সেই হিসাবে চিতারুমের চাইতেও বুড়িগঙ্গা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে।

এই অতি দূষিত বুড়িগঙ্গার একসময় প্রস্থ ছিল ৫০০ মিটার। সেইখানে প্রচুর মাছ ও ডলফিন ছিল। এই নদীর প্রস্থ এখন কোথাও কোথাও মাত্র তিন মিটার। ডলফিন দূরে থাক, মাছও এই নদীতে অতি বিরল। ওয়াসার তথ্যমতে, প্রতিদিন ১২ লক্ষ ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হইতেছে। ইহা ছাড়াও নদনদী-ঘেঁষা শিল্পকারখানার ১৪০টিরও অধিক গোপন সুড়ঙ্গ পথে অপরিশোধিত ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হইতেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে মেডিক্যাল বর্জ্যও ফেলা হইতেছে পরিশোধন না করিয়াই। এই সকল রাসায়নিক বর্জ্যে আছে ক্রোমিয়াম, লেড, সালফিউরিক অ্যাসিড, যাহা শুধু পানিকেই দূষিত করিতেছে না; নদীর তলদেশ এবং উভয় পাড়ের মাটি এমনকি বাতাসকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করিতেছে। ইহাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালি ও কিডনিজনিত রোগ, চর্মরোগসহ ক্যানসারে আক্রান্ত হইতেছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করিয়াছেন।

নদীদূষণের আরেকটি কারণ হইল ব্যাপক হারে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতলের ব্যবহার। বলা হইয়া থাকে, বুড়িগঙ্গা নদীর তলানিতে পলিথিনেরই কমপক্ষে ১০ ফুট পুরু স্তর রহিয়াছে। এই জন্য বুড়িগঙ্গা নদীকে বিশ্বের সবচাইতে বড় ড্রেন বলিয়া উল্লেখ করা হইতেছে। নদীদূষণের অতি ভয়াবহ চিত্র শুধু ঢাকা শহরের নহে, বরং চট্টগ্রামসহ সমগ্র দেশের নদী দূষিত হইতেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়াছে, সমগ্র দেশের ২৯টি প্রধান নদনদীর পানিদূষণ রহিয়াছে বিপজ্জনক স্তরে। একটা সময় আমাদের উদ্বেগের কারণ ছিল শহর ও নগরের পার্শ্ববর্তী নদীগুলি। কারণ শিল্পকারখানা এই সকল অঞ্চলেই অধিক; কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে, কোনো নদীই দূষণের বাহিরে নহে। ইহার কারণ হইল—প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন শিল্পকারখানা নির্মাণ হইতেছে। ফলে দেখা গিয়াছে, সুন্দরবনের আশপাশের নদীতেও দূষণ পাওয়া গিয়াছে। নদীর স্রোত বহিয়া চলে, তাই গ্রামের পাশ দিয়া বহিয়া চলা নদীতেও দূষণ ঘটিতেছে।

মনে রাখিতে হইবে, সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী নদী একটি জীবন্ত সত্তা। দেশের সংবিধান অনুযায়ী নদী হইতেছে জনগণের সম্পত্তি। সুতরাং নদীগুলিকে দূষণ হইতে রক্ষা করিতেই হইবে। মনে রাখিতে হইবে, জলজ প্রাণী ও ইকোসিস্টেম রক্ষার জন্যও নদীদূষণ রোধ করা জরুরি। আমাদের উন্নয়নের মডেলটাই এমন যে, নদীকেই আমরা বর্জ্য ফেলিবার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা তো করিতেই হইবে, তবে নদীকে বাঁচাইয়া তাহা করিতে হইবে। ইহা ছাড়া টিকসই উন্নয়ন সম্ভব নহে। এই জন্য নদীদূষণের সহিত যাহারা জড়িত, তাহাদের সচেতন করিতে হইবে। তাহারা সচেতন না হইলে বিকল্প ও কঠোর পন্থা অবলম্বন করিতে হইবে। আমেরিকাসহ উন্নত দেশেও নদী ও সমুদ্রদূষণের খবর পাওয়া যায়। তবে এই ক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল মানুষকেই সতর্ক হইতে হইবে। কেননা নদনদী ও প্রাকৃতিক জলাশয় না বাঁচিলে আমাদের সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকাটাই কঠিন হইয়া পড়িবে।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন