শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

কোরবানির পশু ক্রয়ে ইসলামি নির্দেশনা

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪, ০২:০৬

কোরবানি বান্দা কর্তৃক মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন ও আত্মত্যাগের অনন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পরিভাষায়, ঈদুল আজহার দিন থেকে, অর্থাত্ ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানির দিনগুলোতে নির্দিষ্ট ধরনের গৃহপালিত পশু জবেহ করাই হচ্ছে কোরবানি। শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করে না, তাদের ব্যাপারে নবিজি (স.) কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। যেমন—রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ :৩১২৩)

তবে কোরবানি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সঠিক পশু নির্বাচন করা জরুরি। হাদিসের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দোষ-ত্রুটিমুক্ত পশু ক্রয় করা সবার জন্য আবশ্যক। কেননা, কোরবানির পশুর মাঝে নির্দিষ্ট গুণাবলি থাকা ও বয়সের হওয়া আবশ্যক, যা ইসলামি শরিয়াহ নির্ধারণ করেছে। তা না হলে কোরবানি বিশুদ্ধ হবে না। যেমন :

(১) পশুর বয়স হওয়া :শরিয়তের বিধানমতে, ‘গৃহপালিত জন্তু যথাক্রমে  উট, গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা বৈধ।’ এগুলো ছাড়া অন্য পশু দ্বারা কোরবানি বৈধ নয়। কোনো প্রকার পাখি দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নেই। (হিদায়া :৪/৪৩২) আলোচ্য পশুগুলোকে কুরআনের ভাষায় বাহিমাতুল ও বাহিমাতিল আনআম, অর্থাত্ চতুষ্পদ জন্তু বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে শব্দগুলো তিন জায়গায় যথাক্রমে সুরা মায়েদার ১ নম্বর আয়াতে এবং সুরা হজের ২৮ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।

কোরবানির ক্ষেত্রে পশু পরিপূর্ণ বয়সের হতে হবে। অর্থাত্, পশুর নির্দিষ্ট বয়স না হলে কোরবানি আদায় হবে না। এক্ষেত্রে উট পাঁচ বছর বয়সের হতে হবে, গরু ও মহিষ দুই বছর হতে হবে এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত। এক দিন কম হলেও বৈধ হবে না। (কিফায়াতুল মুফতি :৮/১৮৯) তবে ফতোয়ার গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘ছয় মাসের ভেড়া, দুম্বা মোটাতাজা হলে এবং দেখতে এক বছর বয়সের ন্যায় দেখা গেলে, এসব পশু দ্বারা কোরবানি করা বৈধ।’

(২) চোখ-কান ঠিক থাকা :যে পশু দিয়ে কোরবানি করা হবে, শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই পশুর চোখ, কান ও লেজ ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। যেমন হজরত আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (স.) আমাদের আদেশ করেছেন, আমরা যেন কোরবানির পশুর চোখ ও কান উত্তমরূপে দেখে নিই। আর আমরা যেন কানের অগ্রভাগ কাটা, কানের পেছন দিক কাটা, লেজ কাটা এবং কানের গোড়া থেকে কাটা পশু কোরবানি না করি। (সুনানে আন-নাসায়ী :৪৩৭২) ফতোয়ার গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, কান ও লেজ অর্ধেক বা অর্ধেকের বেশি কাটা হলে কোরবানি বিশুদ্ধ হবে না। এমনকি উভয় কানের কাটা অংশ যোগ করলে যদি এক কানের অর্ধেক পরিমাণ বা এর চেয়েও বেশি হয়, তাহলে এই পশু দ্বারা কোরবানি না করাই উত্তম। করলে কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। (আহকামে কোরবানি)

(৩) ত্রুটিমুক্ত হওয়া :এছাড়া কোরবানি বিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে পশু দোষ-ত্রুটিমুক্ত হওয়া আবশ্যক। কেননা, রসুলুল্লাহ (স.) পরিপূর্ণ সুস্থ ও দোষমুক্ত পশু দ্বারা কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন—রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, চার ধরনের দোষযুক্ত পশু কোরবানি করা বৈধ নয়। যথাক্রমে :অন্ধ, যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট।  রুগ্ণ, যার রোগ সুস্পষ্ট। খোঁড়া, যার খোঁড়ামো সুস্পষ্ট। বৃদ্ধ ও দুর্বল, যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে। (সুনানে আবু দাউদ :২৮০২)

(৪) দাঁত ও শিং থাকা :পশুর যদি এমন পরিমাণ দাঁত থাকে, যা দিয়ে ঘাস খেতে পারে, তাহলে কোরবানি বৈধ হবে। আর যদি ঘাস খেতে না পারে, তাহলে কোরবানি বৈধ হবে না। চাই দাঁত বেশি থাকুক, আর কম থাকুক। (আহসানুল ফাতওয়া :৭/৫১৪-৫১৫) তবে কোনো পশুর শিং যদি মূল থেকে ভেঙে যায়, তাহলে কোরবানি বিশুদ্ধ হবে না। কেননা, ইয়াজিদ মিসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, ‘রসুলুল্লাহ (স.) কান কাটা, শিংবিহীন, অন্ধ, দুর্বল এবং পা ভাঙা পশু কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (সুনানে আবু দাউদ :২৮০৩) পাশাপাশি, ছাগলের জিহ্বা যদি এই পরিমাণ কাটা হয়, যার ফলে ঘাস ইত্যাদি খেতে অসুবিধা হয়, তাহলে এ ধরনের ছাগল দ্বারা কোরবানি করা বৈধ হবে না। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি :৫/২৯৮)

(৫) পাগল পশু :পাগল পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ। তবে পশু যদি মাঠে না চড়ে এবং ঘাস ইত্যাদি খাওয়ার প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে কোরবানি সহিহ হবে না। (ফতোয়ায়ে  আলমগিরি :৫/২৯৮)

(৬) গর্ভবতী পশু :গর্ভবতী পশু দ্বারা কোরবানি করা বৈধ। কিন্তু বাচ্চা প্রসবের সময় আসন্ন হলে, গর্ভবতী পশু কোরবানি করা মাকরুহ। এছাড়া, পশু কোরবানি করার পরে যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তাহলে ঐ বাচ্চাও কোরবানি করতে হবে এবং গোশত খাওয়া বৈধ হবে। (ইসলামে কোরবানি ও আকিকার বিধান)

উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, কোরবানি করার ক্ষেত্রে পশু দোষ-ত্রুটিমুক্ত হওয়া আবশ্যক এবং এক্ষেত্রে সবার সচেষ্ট থাকা উচিত। কেননা, কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শুধু বান্দার তাকওয়া পৌঁছায়, ভিন্ন কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের মনের তাকওয়া।’ (সুরা হজ :৩৭)।

ইত্তেফাক/এনএন