শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন কেন প্রাতঃস্মরণীয়

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪, ০৫:০০

আজ ৭ জুন। ঐতিহাসিক ৬-দফা দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ৬-দফা আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত এই ৬-দফাকে বলা হয় বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বা মুক্তির সনদ। এই সম্পর্কে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বলিতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ মূলত ৬-দফা ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতাসংগ্রামের বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলসমূহের এক কনভেনশনে অংশগ্রহণ করিয়া বাঙালি নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার জনগণকে বৈষম্যের হাত হইতে রক্ষা ও বাঙালিদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরিয়া আসিয়া তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই বিষয়ে বিস্তারিত তুলিয়া ধরেন।

৬-দফার মূল কথা ছিল :পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো হইবে লাহোর প্রস্তাবের আলোকে একটি ফেডারেশন-ভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ। সরকার হইবে পার্লামেন্টারি ধরনের। আইন পরিষদ নির্বাচিত হইবে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি—এই দুইটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকিবে। সমগ্র দেশের জন্য থাকিবে দুইটি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য থাকিবে পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের ব্যবস্থা ও পৃথক অর্থবিষয়ক নীতিমালা। ইহা ছাড়া, ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্কধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকিবে এবং আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধাসামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখিবার ক্ষমতা দিতে হইবে। ৬-দফার পক্ষে জনসমর্থন বাড়িতে শুরু করিলে লৌহমানব আইয়ুব খান প্রমাদ গুনিতে শুরু করেন। ফলে ঐ বছরের ৮ মে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অধিকাংশ সহযোগীকেও কারা অন্তরিন করা হয়। আওয়ামী লীগ ৬-দফার পক্ষে জনসমর্থন সংগঠিত করা এবং বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে ’৬৬ সালের ৭ জুন আজিকার দিনে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করে। কিন্তু হরতাল পালনকারীদের উপর পুলিশ ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের গুলিবর্ষণের ফলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী এবং দেশের অন্যান্য স্থানে আন্দোলনরত ১১ জন শহিদ হন। অতঃপর এই ৬-দফা আন্দোলনের পথ ধরিয়া আসে ’৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

নীতি-আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সেই সময় ছিলেন ৬-দফার একনিষ্ঠ সমর্থক। ৬-দফা কর্মসূচির পক্ষে জোরালো ভাষায় লেখালেখির কারণেই ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন তাহাকে গ্রেফতার এবং পরদিন রাত্রে নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। ইহাতে ইত্তেফাক গ্রুপের অন্য দুইটি প্রকাশনা সাপ্তাহিক পূর্বাণী ও ইংরেজি সাপ্তাহিক ঢাকা টাইমসও বন্ধ হইয়া যায়। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে ঐক্যের ফলে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং এই পরিষদ স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে বেগবান করিতে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ৬-দফাকে ১১ দফায় রূপান্তরিত করেন। এই ১১ দফা দাবির মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়াসহ ৬-দফার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটে। ইহার ২ নম্বর দাবিতে বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদানের পাশাপাশি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার ওপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়। ৬-দফা আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ লাভ করিলেও তাহার নেতাকর্মীরা ব্যাপক ধরপাকড়ের শিকার হন। ইহা ছাড়া আন্দোলনে যেই সকল শরিক দল ছিল, তাহারা ৬-দফাকে সরাসরি মানিয়া নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১১ দফা ছিল একধরনের কৌশল। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা মনে করেন, দেশ আসলে ৬-দফার ভিত্তিতেই স্বাধীন হইয়াছে এবং ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করিতে ১১ দফা কৌশল ফলপ্রসূ হইয়াছে।

মোটকথা, ৬-দফা আন্দোলনের কারণে বাঙালি তাহার আত্মপরিচয়ের সন্ধান লাভ করে। শহর-নগর ও গ্রাম-গঞ্জের বৃহত্তর মানুষ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। অতএব, এই আন্দোলনকে যুগ যুগ ধরিয়া আমাদের মনে রাখিতে হইবে। ইহা বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে লিখিত থাকিবে স্বর্ণাক্ষরে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন