শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

যুদ্ধবাজরা যাহা বুঝিতে চাহেন না

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০৫:৩০

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত জিওফ্রে নরম্যান ব্লেইনি তাহার ক্ল্যাসিক বই ‘দ্য কজেস অব ওয়্যার’-এ দেখাইয়াছেন, যুদ্ধ একবার আরম্ভ হইলে কেন তাহা আর সহজে থামানো যায় না। যুদ্ধ প্রলম্বিত হইবার কারণ হিসাবে তিনি বলিয়াছেন, সচরাচর যুদ্ধের শুরুটা হয় কোনো একটি পক্ষের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের চিন্তা হইতে। তবে সেই ক্ষেত্রে মুশকিল হইয়া উঠে যুদ্ধের ‘ভুল হিসাবনিকাশ’, যাহা প্রায় ক্ষেত্রেই যুদ্ধবাজপক্ষের চোখে পড়ে না। খুব দ্রুত ও সহজে এবং স্বল্পমাত্রার ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়েই বিপক্ষশক্তিকে ধরাশায়ী করিয়া চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা যাইবে—সাধারণত এমন চিন্তা হইতেই যুদ্ধের ঘণ্টাধ্বনি বাজায় কোনো কোনো পক্ষ। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শক্তিধর বিভিন্ন পক্ষের সম্পৃক্ততায় বিজয়লাভের সমীকরণ ক্রমশ কঠিনতর হইয়া উঠে। অতীতের প্রায় সকল যুদ্ধেই যুদ্ধবাজদের এহেন ভুল হিসাবনিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৭৯২ সালে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, প্রুশিয়া ও ফ্রান্সের সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটিয়া গিয়াছিল এই বিশ্বাসে যে, একটি বা দুইটি সংঘর্ষের পরেই যুদ্ধ শেষ হইয়া যাইবে, সমস্যার সমাধান হইবে; কিন্তু সেই সংঘাত গড়াইয়াছিল প্রায় ২৫ বছর পুনরাবৃৃত্তিমূলক যুদ্ধে। আরো ভয়ানক কথা, এই যুদ্ধ প্রধান শক্তিগুলিকে যুদ্ধের ময়দানে টানিয়া আনিয়াছিল, যাহার ফলে যুদ্ধ ছড়াইয়া পড়ে গোটা বিশ্বে। একই ধরনের চিন্তার বশবর্তী হইয়া ১৯১৪ সালের আগস্টে ইউরোপের দেশগুলি যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। তাহাদের ধারণা ছিল, সৈনিকেরা অতি অল্প সময়েই যুদ্ধ জয় করিয়া ক্রিসমাস বা বড়দিনের ছুটিতে ঘরে ফিরিয়া আসিবে। সৈন্যরা ঘরে ফিরিয়া আসিয়াছিল বটে, তবে ১৯১৮-এর আগস্টে!

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কথাই যদি ধরা হয়, তিনি ভাবিয়াছিলেন—খুব সহজেই ইউক্রেনকে কবজা করিতে পারিবেন। কিন্তু তিনি কি তাহা পারিয়াছেন? অবশ্যই নয়। বরং ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখনো চলিতেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই বিশ্ব প্রবেশ করে ইসরাইল-হামাস সংঘাতের যুগে। এই যুদ্ধও বন্ধ হয় নাই। উপরন্তু ইহা যেন পৃথিবীর জন্য নূতন ‘মহা সংকট’ হইয়া উঠিতেছে। এখন পর্যন্ত এই রণক্ষেত্রে প্রাণ ঝরিয়াছে ৩৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির, যেইখানে যুদ্ধাহতদের সংখ্যা প্রায় লক্ষের কাছাকাছি। সবচাইতে দুঃখজনক হইল, এই যুদ্ধে নিহতদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। উল্লেখ্য, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে চলমান সংঘাতের শুরুটা ইসরাইলি ভূখণ্ডে হামাসের আক্রমণের সূত্র ধরিয়া। গত বত্সরের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের নজিরবিহীন হামলায় নিহত হয় ১ হাজার ২০০ ইসরাইলি। অতঃপর ইসরাইলি বাহিনীর পালটা হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা লাশের সারিতে কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া উঠে।

উড্রো উইলসন বলিয়াছেন, ‘একবার যুদ্ধ শুরু হইলে সহনশীলতা বলিয়া যে কোনো ব্যাপার আছে, পক্ষগুলি তাহা যেন ভুলিয়াই যায়।’ সত্যিই, গাজা যুদ্ধে সহনশীলতার চিহ্ন মাত্র নাই! অন্যান্য যুদ্ধের মতোই এই সংঘাতের বড় ভুক্তভোগী বেসামরিক মানুষ তথা সাধারণ জনগণ, যাহারা যুদ্ধ না করিয়াও যুদ্ধের শিকার। পিয়ার্স ব্রাউনের কথাই যেন তাহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—‘আমরা শান্তিতে থাকিতাম। কিন্তু শত্রুরা আমাদের যুদ্ধের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছে।’ প্রশ্ন হইল, গাজা যুদ্ধকে টানিয়া লম্বা করিতেছে কে বা কাহারা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বারবার গাজায় হামলা চালাইবার ব্যাপারে নিষেধ ও সতর্ক করিতেছে। গোটা বিশ্বই এই ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। ইহার পরও কেন যুদ্ধ থামিতেছে না? ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করিতেছেন বলিয়া গুঞ্জন রহিয়াছে; কিন্তু তাহার হিসাবনিকাশ কতখানি সঠিক? তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগামী ইসরাইল তো চাইলেই হামাসের প্রতি জন সদস্যকে ‘পিন পয়েন্ট’ করিয়া নির্মূল করিবার সামর্থ্য রাখে! তদুপরি হামাস নিধনের নামে সাধারণ নিরীহ মানুষ হত্যার পেছনে কী হিসাবনিকাশ থাকিতে পারে? অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের জনগণকে হামাসের ‘মানবঢাল’ হিসাবে ব্যবহার করার মধ্যেই-বা কী হিসাবনিকাশ আছে? এইভাবে নিরীহ, নিরপরাধ শিশুদের হত্যার মধ্য দিয়া আর যাহাই হউক, কোনো হিসাবই আলোর মুখ দেখিবে না।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন