শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

খরা ও মরুকরণ রুখতে হবে ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০২:৩২

বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব পরিবেশই বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাতাস ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই বায়ু তথা পরিবেশদূষণে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে ঢাকা এক নম্বরে অবস্থান করছে। এটা আমাদের জন্য চরম অশনিসংকেত ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সবুজ ভবিষ্যতের যাত্রায় ধরণি যেন আমাদের দিকে চেয়ে আছে। মরুকরণ প্রতিরোধে জাতিসংঘ কনভেনশনের ৩০তম বার্ষিকী উদ্যাপনের আয়োজন হয়েছে ২০২৪ সালে। ২ থেকে ১৩ ডিসেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হবে মরুকরণ মোকাবিলায় জাতিসংঘ কনভেনশনের (ইউএসডিসির) ষোলোতম অধিবেশন। সমগ্র বিশ্ব আশা করছে, সেখানে যেন ভালো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল লক্ষ্য ছিল অগ্রাধিকার হিসেবে ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ এবং খরা প্রতিরোধ। থিম নির্ধারণ করা হয়—‘ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ এবং খরা স্থিতিস্থাপকতা।’ সেজন্য বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ‘আমাদের ভূমি’ স্লোগানের অধীনে ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ এবং খরা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় “Land restoration, desertification and drought resilience” থিমের ভাবানুবাদ করেছেন—‘করব ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখব মরুকরণ; অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’। সঠিক সময়ে সঠিক থিম নির্ধারিত হয়েছে, এখন প্রয়োজন বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে যথাযথ বাস্তবায়ন।

ভূমি পুনরুদ্ধার (Land Reclamation) হলো জমিগুলো আরো নিবিড় ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ও উন্নত করার প্রক্রিয়া। যেমন—সেচের মাধ্যমে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি থাকা অঞ্চলের উন্নতি, লবণাক্ত বা ক্ষারীয় জমি থেকে ক্ষতিকারক উপাদানগুলো অপসারণ, জোয়ারের জলাভূমির ডাইকিং এবং নিষ্কাশন, স্ট্রিপ-খনি লুণ্ঠন অঞ্চলগুলোর মসৃণ ও পুনরুত্পাদন এবং অনুরূপ কার্য। এটা নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য ক্ষয়প্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বা বিকশিত জমিকে আরো প্রাকৃতিক, উপযোগী বা টেকসই অবস্থায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া। অনেকে বলেন, ভূমি পুনরুদ্ধার এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে চাষাবাদের জন্য হারানো জমিকে শুধু পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা নয়, বরং ভূমির এমন উন্নয়ন ঘটানো, যাতে ভূমি অর্থনৈতিক (কৃষিসহ) বা সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে উপযোগী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে কিছু ভূমির ধরন ও ব্যবহূত কৌশলসমূহ হলো :জলমগ্ন ভূমি বা জলাবদ্ধ ভূমি (জলপূর্ণ নিম্নাঞ্চলে জল নিষ্কাশনের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার উপযোগী করে তোলা); অনুর্বর ভূমি (সেচের মাধ্যমে এবং লবণাক্ত হলে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের মাধ্যমে); অস্থায়ী ঢালু ভূমি ও শিথিল মৃত্তিকা (গাছপালা রোপণের মাধ্যমে মাটি আটকে রাখা); পানিসৃষ্ট ক্ষয়প্রবণ ভূমি (গাছপালা রোপণের মাধ্যমে, ভূমি সোপান নির্মাণের মাধ্যমে, বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে মাটি আটকে রাখা); লবণ বা শিল্পবর্জ্যের দ্বারা দূষিত পরিব্যাপ্ত ভূমি (রাসায়নিক পরিশোধন প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে); অনাকাঙ্ক্ষিত গাছপালা অথবা ঝোপঝাড় আবৃত ভূমি (পরিষ্কারকরণের মাধ্যমে)। ভূমি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পানিসৃষ্ট ক্ষয় এবং উপকূলীয় এলাকায় বঙ্গোপসাগর থেকে ভূমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার পেতে পারে। সামগ্রিকভাবে ৩৬টিরও বেশি ধরনের ভূমি ক্ষয় মূল্যায়িত হতে পারে, যা মানুষের দ্বারা ঘটে থাকে। যেমন—মাটির ক্ষয়, মাটিদূষণ, মাটির অম্লকরণ, শিটক্ষয়, পলি, শুষ্ককরণ, লবণাক্তকরণ, নগরায়ণ ইত্যাদি। এছাড়া গবাদি পশু দ্বারা অতিরিক্ত চরানো জমির ক্ষয় হতে পারে। ভূমিক্ষয় একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যা মূলত কৃষি ব্যবহার, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন:

ক. ভূমি ছাড়পত্র, যথা—পরিষ্কার করা এবং বন উজাড় করা, খ. দুর্বল চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে মাটির পুষ্টি হ্রাস, গ. ওভারগ্রাজিং ও ওভারড্রাফটিংসহ পশুসম্পদ, ঘ. অনুপযুক্ত সেচ ও ওভারড্রাফটিং, ঙ. শহুরে বিস্তৃতি ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন, চ. যানবাহন অফ-রোডিং, ছ. পাথর, বালু, আকরিক ও খনিজ উত্তোলন, জ. স্কেল অর্থনীতির কারণে ক্ষেত্রের আকার বৃদ্ধি, বন্যপ্রাণীর জন্য আশ্রয় হ্রাস, হেজরো ও কোপস অদৃশ্য হওয়ার কারণে, ঝ. ভারী যন্ত্রপাতি দ্বারা ফসল কাটার পর নগ্ন মাটির প্রকাশ, ঞ. মনোকালচার, স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করে, ট. প্লাস্টিকের মতো নন-বায়োডিগ্রেডেবল ট্র্যাশ ডাম্পিং, ঠ. আক্রমণকারী প্রজাতি, ড. জলবায়ু পরিবর্তন, ঢ. মাটির কার্বনের ক্ষতি ইত্যাদি, ভূমি ক্ষয়ের ফল মারাত্মক ও বেশ জটিল। এর মধ্যে রয়েছে কম ফসলের ফলন, কম বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র, বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য আরো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় মানুষ তাদের বাড়িঘর হারায়, কম খাদ্য উপলব্ধ এবং অর্থনৈতিক সমস্যা। ক্ষয়প্রাপ্ত জমিও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরো খারাপ করে তোলে। প্রয়োজনীয় জমির জন্য অনেক সবুজ ফসল ও গাছপালা অপসারণ করা হয়েছে, যা প্রকৃতির জন্য ক্ষতির অন্যতম কারণ। ভূমির অবক্ষয় এবং চারপাশের পরিবেশের ওপর এর প্রভাব দেখার চারটি প্রধান উপায় রয়েছে। সেগুলো হলো—

১. জমির উত্পাদনক্ষমতা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে কমে যাওয়া। এটি জৈব বস্তুর ক্ষতি, প্রকৃত উত্পাদনশীলতা বা সম্ভাব্য উত্পাদনশীলতার ক্ষতি বা উদ্ভিদের আবরণ এবং মাটির পুষ্টির ক্ষতি বা পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখা যায়।

২. মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য সম্পদ ভূমির সক্ষমতা কমে যায়। ৩. জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি :পরিবেশগত মানের হ্রাস হিসাবে প্রজাতির পরিসীমা বা বাস্তুতন্ত্রের জটিলতা হ্রাস।৪. পরিবেশগত ঝুঁকির স্থানান্তর :পরিবেশ বা মানুষের ধ্বংস বা সংকটের ঝুঁকি বৃদ্ধি। এটি পূর্ব বিদ্যমান সংকট বা ধ্বংসের ঝুঁকি আকারে পরিমাপ করা হয়।

জমির অবক্ষয় সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, একদল লোক যাকে অবক্ষয় হিসাবে দেখে, অন্যরা সুবিধা বা সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারী বৃষ্টিপাত এবং খাড়া ঢালসহ একটি স্থানে ফসল রোপণ করা জলের দ্বারা মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকির বিষয়ে বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশগত উদ্বেগ তৈরি করবে, তবু কৃষকেরা উচ্চ ফসল ফলনের জন্য এই অবস্থানকে অনুকূল হিসেবে দেখতে পারে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত ভূমির অবক্ষয় (জল, বায়ু ও যান্ত্রিক ক্ষয়, ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক অবক্ষয়) ছাড়াও গত ৫০ বছরে আরো চারটি প্রকারের আবির্ভাব ঘটেছে : ক. দূষণ, প্রায়ই রাসায়নিক, কৃষি, শিল্প, খনির বা বাণিজ্যিক কার্যকলাপের কারণে; খ. নগর নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ, ভূমি রূপান্তর, কৃষি সম্প্রসারণ ইত্যাদি কারণে আবাদি জমির ক্ষতি; গ. কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা, কখনো কখনো দুর্ঘটনাজনিত; ঘ. সশস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত ভূমি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা।

গাছপালার ওভারকাটিং ঘটে যখন লোকেরা বন, বনভূমি ও ঝোপঝাড় কেটে ফেলে; কাঠ, জ্বালানি কাঠ এবং অন্যান্য পণ্য পেতে প্রাকৃতিক পুনঃবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়। এটি আধা শুষ্ক পরিবেশে ঘন ঘন হয়, যেখানে জ্বালানি কাঠের ঘাটতি প্রায়ই তীব্র হয়। ওভারগ্রাজিং হলো প্রাকৃতিক চারণভূমির চারণ, যা পশুসম্পদ বহন করার ক্ষমতার ওপরে ব্যবহার করা হয়, যা গাছপালার আবরণ হ্রাস, বায়ু ও জলশয় কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ। ভূমি বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে। যেমন :

শুষ্ক জমি পুনরুদ্ধার ও পানির ঘাটতি পূরণে সেচের বিকল্প নেই; লবণাক্ত পানি শোষণের ফলে মাটি ব্যবহার অনুপোযোগী হলে মাটি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে হবে; যেখানে অতিরিক্ত জল মাটিতে জমে, সেখানে অনেক জমি ফসল উত্পাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ ধরনের ভেজা অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যেখানে অফশোর ল্যান্ড বাজোয়ারের জলাভূমিগুলো অগভীর জল দ্বারা আচ্ছাদিত এবং অতিরিক্ত জমি গুরুতরভাবে প্রয়োজন, তীরের প্রায় সমান্তরালে ডাইক নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি পুনরুদ্ধার করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে জোয়ারে জলাভূমির পুনরুদ্ধার ডাইক দ্বারা জোয়ারের মোহনার মুখ বন্ধ করে উপকূলীয় অঞ্চল পুনরুদ্ধার সম্পন্ন করা যেতে পারে। খনি লুণ্ঠন পুনরুদ্ধার; ক্ষয়প্রাপ্ত, অনুর্বর, বর্জ্যভূমি এবং মূল জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উর্বর জমিতে রূপান্তর এবং প্রান্তিক মাটির ভৌত গঠন ও গুণমান উন্নত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমি পুনরুদ্ধারের একটি সম্ভাব্য প্রভাব হলো বাস্তুতন্ত্রের ব্যাঘাত এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করে ভারসাম্য তৈরি করা। তার পাশাপাশি শিকারি-শিকার সম্পর্ক এবং সম্পদ উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলো সাধারণত ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয়, যা ভূমিতে বসবাসকারী বা এটি পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভরশীল লোকদের স্থানচ্যুত করতে পারে। এসব জমির মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং যোগাযোগ এই সমস্যাগুলো প্রশমিত করতে সাহায্য করতে পারে।

পুনরুদ্ধারকৃত জমি যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি কৃষিকাজ, বাড়িঘর, স্কুল, অফিস, কারখানা ও রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে। সেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করবে। যথাযথ ভূমি পুনরুদ্ধার, ভূমির যথাযথ ব্যবহার সমগ্র ধরণিকে আবারও সবুজে ভরিয়ে তুলবে, ফিরে পাবে প্রাণ। তবেই আমরা আমাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে থাকা খরা ও মরুময়তাকে রুখে দিতে সক্ষম হব।

লেখক: পরিবেশবাদী, জেলা অ্যাম্বাসেডর, শিক্ষক ও প্রভাষক, সরকারি ফুলুলা

মহিলা কলেজ, ফুলুলা, খুলনা

 

ইত্তেফাক/এমএএম