শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মনগড়া খাত দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন, ফেরত দিতে গড়িমসি ঢাবি অধ্যাপকের

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ১৩:২৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউসুফের বিরুদ্ধে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যান থাকাকালীন অসুদাপায়ে ব্যাংক থেকে ফান্ড তুলে নিয়েছেন। পরে এই ঘটনায় একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন হলে ওনারা অভিযোগের সত্যতা পান। ওই কমিটির প্রতিবেদনে অধ্যাপক ইউসুফের বিরুদ্ধে ২৬ লাখ ৪১ হাজার ৯১২ টাকা আর্থিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয় এবং নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হলেও এখনো সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেননি অধ্যাপক ইউসুফ। 

জানা যায়, ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত আরবি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউসুফ। পরবর্তী ২০২০ সালের ২২ মার্চ অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কাদির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পরও আব্দুল কাদির বিভাগের ব্যাংকহিসাব বুঝে না পাওয়ায় সোনালী ব্যাংকের স্ট্যাটমেন্ট বা বিবরণী সংগ্রহ করেন। ওই বিবরণীতে হিসাবের অসঙ্গতি লক্ষ্য করলে তা বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়। একাডেমিক কমিটি পর্যালোচনা করে তৎকালীন চেয়ারম্যানকে সমন্বয়ক করে চার সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে। কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে তা একাডেমিক সভায় উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। 

যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য
যাচাই-বাছাই কমিটির প্রতিবেদনে অধ্যাপক ইউসুফের বিরুদ্ধে বিভাগের ফান্ড হতে ২৬ লাখ ৪১ হাজার ৯১২ টাকা বিধিবহির্ভূত উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে। বিভাগের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করলে নিয়ম অনুযায়ী তা হিসাব বহিতে উত্তোলন/জমা অংশে খরচের সম্ভাব্য খাতসহ সেটি লিখে রাখতে হয়। তবে তদন্ত কমিটি দেখতে পায় অভিযুক্ত অধ্যাপক ২১টি চেকের মাধ্যমে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন যার কোন তথ্য তিনি হিসাব বহিতে উল্লেখ করেননি। এর মধ্যে চেয়ারম্যান থাকার সময় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা পুনরায় বিভাগের অ্যাকাউন্টে জমা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যকাউন্টিং বিধি ও ক্রয় বিধি অনুযায়ী বিভাগের ফান্ড হতে ২৫ হাজার টাকার বেশি উত্তোলন করতে হলে বিভাগের সিএন্ডডি কমিটি ও ক্রয় কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। 

যাচাই-বাছাই কমিটি দেখতে পায় অনেকক্ষেত্রেই এই বিধি লঙ্ঘন করেছে এই অধ্যাপক। এছাড়াও, জেনারেটরের নামে ভুয়া বিল, চেয়ারম্যান থাকাকালে চেয়ারম্যানের মাসিক ১০০০ টাকা যোগাযোগভাতা গ্রহণ করেছেন তিনি। 

যাচাই-বাছাই কমিটি আরও দেখতে পায়, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ একাডেমিক কমিটির সভা না করেও সভার আপ্যায়ন খরচ দেখিয়েছেন। এছাড়া একই খরচ একাধিকবার উল্লেখ ও বিভাগ বহির্ভূতব্যায় ক্যাটাগরিতে খরচ দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন তিনি।

বিভাগের একাধিক শিক্ষক জানান, অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হলে ৮ লাখ টাকা জমা দিয়ে বাকি টাকা না দিতে গড়িমসি করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ। এমনকি টাকা ফেরত দেবেন না বলে বিভাগকে জানিয়ে দেন তিনি।

এক্ষেত্রে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের নাম দিয়ে মুচলেকার কথা বলেও বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চান। যদিও এ বিষয়ে তিনি কোনো লিখিত ডকুমেন্টস দেখাতে না পারলে একাডেমিক কমিটি তা গ্রহণ করেননি।

পরবর্তীতে বিভাগ কোনো টাকা পায় না বলে দাবি করেন অধ্যাপক ইউসুফ। যদিও শিক্ষার্থীদের ও বিভাগের এই টাকা কোনোভাবেই হাতছাড়া হোক, তা চান না বলে জানান বিভাগের অন্য শিক্ষকরা।

অভিযুক্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘আমার কাছে বিভাগ যে টাকা পেত তা আমি ইতোমধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছি। বিভাগ আমার কাছে আর কোন টাকা পাবে না। কমিটি ২৬ লাখ টাকার কথা বলছে। তারা নিজেদের মত করে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। কমিটিকে বলেছি, একজন এক্সপার্ট দিয়ে আপনারা হিসাব অডিট করান। কিন্তু ওনারা তা করেননি। 

তবে মাসিক এক হাজার টাকা করে যোগাযোগ ভাতা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এই টাকা তারা চাইলে অবশ্যই ফেরত দিয়ে দিব।’

যাচাই-বাছাই কমিটির সমন্বয়ক বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল কাদির বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি কিছু টাকা বিভাগে দিয়েছেন। বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি। অ্যাকাউন্টিংয়ের একজন অধ্যাপককে তিনি নিয়ে এসেছেন হিসাব দেখার জন্য। সেই অধ্যাপক আমাদের হিসাবের সঙ্গে আরও ত্রিশ হাজার টাকা বেশি যোগ করেন। ওনার সময়ে বিভাগের ব্যায় ও টাকা উত্তোলনের তথ্য দেখেই আমরা এই গড়মিল দেখতে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে এই হিসাব অডিট করে দেখতে পারে।’ 

আরবি বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, ‘শুরুতে বিভাগের পাওনা কিছু টাকা তিনি দিয়েছেন। বিষয়টি এখনো সমাধান হয়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘এই আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি বিভাগ থেকে কেউ জানাননি। বিষয়টি আগে শুনেছি সমাধান হয়ে গেছে। বিভাগ থেকে যদি আর্থিক অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে।’

ইত্তেফাক/এসজেড