শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মহাসড়কে সীমা লঙ্ঘনের খেলা বন্ধ হউক

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০৫:৩০

প্রকৌশল জগতে সকল কিছুরই নির্দিষ্ট সক্ষমতা ও ধারণক্ষমতা থাকে। এখন যদি ধারণক্ষমতাকে অতিক্রম করিবার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে, তাহা হইলে সেইখানে সমূহ ক্ষতি ঘটিবে। আমাদের মহাসড়কগুলির ওজন বহনের নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রহিয়াছে। কিন্তু মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের প্রবণতা ক্রমশ বাড়িতেছে। ইহার ফলে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে, অপচয় হইতেছে সরকারের বিপুল অর্থ। এই সমস্যা নিরসনে দেশের ২১টি স্থানের ২৮টি পয়েন্টে ওজন কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে বটে, কিন্তু ইতিমধ্যে এই জন্য যেই পরিমাণ ক্ষতির শিকার হইতেছে আমাদের মহাসড়কগুলি, তাহা অচিন্তনীয়।

ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ওজন স্কেল না থাকিবার কারণে কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গের মহাসড়ক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। ইহার ফলে জনগুরুত্বসম্পন্ন দুইটি সড়কসেতু ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হইয়াছে, প্রতিনিয়ত ধারণক্ষমতার দেড়/দুই গুণ অধিক পণ্যবোঝাই ট্রাক চলাচলে হাজার হাজার কোটি টাকায় নির্মিত আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়ক মেয়াদ শেষ হইবার পূর্বেই হইয়া যাইতেছে চলাচলের অযোগ্য। পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্য বহনকারী ট্রাকের কারণে ছোট ও মাঝারি সেতু-কালভার্টগুলি রহিয়াছে ঝুঁকির মুখে। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ট্রানজিট পয়েন্ট হইল কুষ্টিয়া জেলা। বেনাপোল, ভোমরা স্থলবন্দর, নওয়াপাড়ার বাফার গুদামের সার ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে খালাসকৃত পণ্যের বড় বড় ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ জাতীয় মহাসড়কের ওপর দিয়া উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করিয়া থাকে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের হিলি, সোনা মসজিদ ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি করা খোয়া আকৃতির ছোট পাথর, নতুন নতুন রেলপথ স্থাপনে বড় আকৃতির পাথর, ইটভাটায় ব্যবহূত কয়লাসহ অন্যান্য আমদানি পণ্য ট্রাকযোগে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক ও কুষ্টিয়া-দাশুড়িয়া জাতীয় মহাসড়ক হইয়া কুষ্টিয়ার ওপর দিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমের বিভিন্ন জেলায় প্রবেশ করিয়া থাকে। রুট পারমিট ও ব্লু বুক মতে, ধারণক্ষমতার অধিক পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানিতেছে না ট্রাক মালিক-ড্রাইভাররা। আর সবচাইতে বড় অসুবিধা হইল, কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের মহাসড়কের কোনোটিতে নাই ট্রাকবোঝাই পণ্য পরিমাপে ওজন স্কেল। সড়ক ও জনপদ বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে তাহাদের আওতাভুক্ত সড়ক রহিয়াছে ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। এই সকল রাস্তায় মালামালসহ সর্বোচ্চ সাড়ে ১৫ টনের গাড়ি চলাচলের কথা। কিন্তু ২০ হইতে ৩০ টন ওজনের গাড়িও চলাচল করিতেছে সড়কে। মনে রাখিতে হইবে, সড়ক বিভাগের তথ্যনুযায়ী একটি ট্রাক ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ ওজন বহন করিলে মহাসড়কের ক্ষতি হয় ১৬ গুণ। সরকার প্রণীত এক্সেল নীতিমালা অনুযায়ী, মহাসড়কে চলাচলকৃত ছয় চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা (যানবাহন ও মালামালসহ) সাময়িক সময়ের জন্য ২২ টন, ১০ চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা সাময়িক সময়ের জন্য ৩০ টন এবং ১৪ চাকাবিশিষ্ট মোটরযানের সর্বোচ্চ ওজনসীমা সাময়িক সময়ের জন্য ৪০ টন নির্ধারণ করা রহিয়াছে।

কিন্তু ইহা যেন কাজির গরু—কেতাবে আছে, বাস্তবে ইহার প্রয়োগ নাই। এই নীতিমালা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানা হইতেছে না বিধায় আমাদের অনেক সড়কেরই আয়ুষ্কাল দ্রুত শেষ হইয়া যাইতেছে। অন্যদিকে এই কারণে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বৃদ্ধি পাইতেছে। তাহা ছাড়া অতিরিক্ত ওজন বহনকারী যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনারও অন্যতম কারণ। স্বস্তির কথা হইল—চট্টগ্রাম, তামাবিল, মোংলাসহ বিভিন্ন মহাসড়কের ২১টি স্থানে রাস্তার প্রবেশমুখে বসানো হইতেছে স্বয়ংক্রিয় মেশিন। ‘এক্সেল লোড’ নামে পরিচিত এই মেশিন অতিরিক্ত পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে আটকাইয়া দিবে। পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে—‘সীমা লঙ্ঘন করিও না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা :বাকারা, আয়াত :১৯০)। আমরাও মনে করি, শুধু মহাসড়কেই নহে, আমাদের যাপিত জীবনের কোনো ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নহে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন