উড়ালসড়কের নিচের মহামূল্যবান জমির মহা-অপচয়

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০৬:৩০

রাজধানীতে একখণ্ড জমি স্বর্ণের চাইতেও দামি। অথচ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে রাজধানীর উড়ালসড়কের নিচের অধিকাংশ জমিরও অপব্যবহার হইতেছে। রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে গত দুই দশকে উড়ালসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি, ইউলুপ ও মেট্রোরেলসহ নানারকম উড়ালপথ নির্মিত হইয়াছে। বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত মোট ১০৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সকল উড়ালপথের নিচে দখল-বেদখল ও অপব্যবহারে পড়িয়া রহিয়াছে প্রায় ২০৭ একর জমি। উড়ালসড়কের মূল্যবান জমি দখল করিয়া কোথাও গড়িয়া উঠিয়াছে ওয়ার্কশপ, কোথাও দেখা যায় গুদামঘর। কেহ কেহ আবার ছোটখাটো দোকান বসাইয়াছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উড়ালসড়কের নিচের মহামূল্যবান জমির এই ধরনের অপব্যবহারের নেপথ্যে রহিয়াছে চাঁদাবাজির অভিযোগ।

একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় উড়ালসড়কের জমির অপচয়ের ফলে প্রতি বত্সর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াইতেছে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে—বাংলাদেশি মুদ্রায় যাহা অন্তত সাড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা। নগরবিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সকল জমিতে জনগণের জন্য পাবলিক টয়লেট, খেলার মাঠ, সবুজায়ন, হাঁটিবার পথ, জলাধারসহ নানান উপায়ে ব্যবহার উপযোগী করিয়া গড়িয়া তোলা সম্ভব। অথচ ইহার বিপরীতে এই সকল স্থান হইয়া উঠিতেছে অপরাধী ও মাদকসেবীদের অভয়াশ্রম। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, সরেজমিনে রাজধানীর কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা, মহাখালী, মালিবাগ, মৌচাক, খিলগাঁও, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মগবাজার, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরিয়া উড়ালসড়কগুলোর নিচের জায়গার দখল-দূষণের ভয়াবহ চিত্র দেখা গিয়াছে। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার ও মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে বেশকিছু জায়গায় পার্কিং, অস্থায়ী কাঁচাবাজার, ময়লা ফেলিবার ভাগাড় এবং ছোট ছোট দোকান গড়িয়া উঠিয়াছে। কোথাও কোথাও অন্ধকারে ছিন্নমূল মানুষ আবাস গড়িয়া তুলিয়াছে। অনেক সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাগুলিতে মাদকসেবন ও মাদক কেনাবেচা হয়। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কিছু কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে সবুজায়ন করিতে দেখা গিয়াছে বটে, তবে সামগ্রিকভাবে এই বিপুল মূল্যবান জমি লইয়া কোনো নীতিমালা তৈরি হয় নাই। ফলে অধিকাংশ জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় নাই।

রাজধানীর জমি অতি মূল্যবান বিধায় উহা কখনোই খালি পড়িয়া থাকিতে পারে না। সেই জমিতে কিছু না কিছু গড়িয়া তুলিয়া যাহারা সেইখান হইতে চাঁদা তুলিবার পথ তৈরি করে, সেই মতলবাজগোষ্ঠী এই সুযোগ সহজে হাতছাড়া করিতে চাহিবে না বটে। ফলে তাহারা চাহে না এই জমির সঠিক ব্যবহারের নীতিমালা গড়িয়া উঠুক। সামগ্রিক ক্ষতির খতিয়ান আমরা আগেই উল্লেখ করিয়াছি, অধিক বিপদ হইল মাদকের কারবার লইয়া। মাদকের বিকিকিনির কাঁচা টাকা বিভিন্ন প্রভাবশালী জায়গায় ভাগ হয়। ফলে মাদকের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি থাকা সত্ত্বেও এই কারবারিদের রোখা যাইতেছে না। ইহার ফলে একদিকে যুবসমাজের ক্ষতি হইতেছে, অন্যদিকে অপচয় হইতেছে রাজধানীর অতি মূল্যবান জমি। তাহা ছাড়া ঝুপড়িদোকান কিংবা ছিন্নমূল অপরাধীদের আড্ডাখানায় পথচারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নের পাশাপাশি উড়ালসড়কেরও ক্ষতি হইয়া থাকে। যেমন—হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে দখল করিয়া দোকানঘর তুলিবার কারণে সেইখানে আগুন লাগিবার ঘটনাও ঘটে। যাহার কারণে ফ্লাইওভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুতরাং ফ্লাইওভার যেমন নগরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থাকে গতিশীল করিতেছে, তেমনি ইহার নিচের জায়গাগুলিও গণপরিসর তৈরিতে এবং জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করিতে হইবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে বর্তমানে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড স্ট্রাকচারের নিচের অংশে জনবান্ধব, টিকসই ও সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার উপযোগী কমিউনিটি জোন তৈরি করা হইতেছে, যেইখানে থাকিতেছে হাঁটাচলার পথ ও সাইকেলের লেন, নগর-কৃষি, বাগান, বনায়ন ও  খেলাধুলার ব্যবস্থা। কিছু জায়গায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শরীরচর্চা কেন্দ্র, সুইমিং পুল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পথনাটক ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা হইতেছে। সার্বিকভাবে উড়ালসড়কের মতো অবকাঠামোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন। মহামূল্যবান এই বিপুল জমির অপচয় এইভাবে দিনের পর দিন মানিয়া লওয়া যায় না। রাজার ভান্ডার যে শূন্য হইয়া যাইতেছে, ইহা তাহার অন্যতম কারণ। সর্বত্র বিরাজমান ঘুষ-দুর্নীতি ও অপচয়ের মতো এই অপচয় ও জাতীয় ক্ষতিও আমাদের কাটাইয়া উঠিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন