বাজেটে অপ্রদর্শিত সম্পদ ও কালোটাকা বৈধকরণ প্রসঙ্গে

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০৫:৩০

জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে অপ্রদর্শিত সম্পদ বা কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা সাদা করতে সরকারকে কর দিতে হবে মাত্র ১৫ শতাংশ। সেক্ষেত্রে আয়ের উত্স নিয়েও আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। আর প্রদর্শিত বা বৈধ আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার হবে এর দ্বিগুণ বা ৩০ শতাংশ। এ বিষয়ে বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, কোনো করদাতা স্থাবর সম্পত্তি যেমন—ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও ভূমির জন্য নির্দিষ্ট করহার এবং নগদসহ অন্যান্য পরিসম্পদের ওপর ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করলে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকারের প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না।’

তাত্ত্বিকভাবে কালোটাকার বিষয়টিকে অর্থনীতির চর্চায় তেমনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না বিশেষত শিক্ষা কিংবা গবেষণা কার্যক্রমে। অথচ অর্থনীতিতে এটি জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে রয়েছে, যা উত্পাদনশীল খাতে ব্যয় করা হলে দেশের উত্পাদন ও কর্মসংন্থান উভয়টি বৃদ্ধি পেত। দেশের কর আইনে কালোটাকার সংজ্ঞা না থাকলেও অপ্রদর্শিত আয় কথাটি উল্লেখ আছে বিধায় যে ব্যক্তি তার আয়কর রিটার্নে তার আহরিত আয় প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন, সেই টাকাকেই কালো বলে ধরা হয়; যদিও এই আয় অবৈধ পথে না-ও হতে পারে। এখন অনেকে বলছেন, অপ্রদর্শিত আয় দুই রকমের যথা :(১) বৈধ অর্জন কিন্তু আয় রিটার্নে প্রদর্শিত হয়নি; (২) অবৈধ উপায়ে অর্জন; যার ওপর আয়কর দেওয়া হয়নি। অর্থনৈতিক দর্শনে কালোটাকাকে বিভিন্নরূপে দেখানো হয়েছে। যেমন—ধূসর, নিমজ্জিত, অনানুষ্ঠানিক, সুপ্ত, সমান্তরাল ইত্যাদি। যার মূল উত্স অনৈতিকতার ছাপে আবদ্ধ বিভিন্ন রূপে যেমন—ঘুষ, মানুষ পাচার, স্বর্ণ পাচার, চাঁদাবাজি, জমি কেনাবেচার দালালি ইত্যাদি।

আয়কর আইনের ১৯(ই) ধারায় ৩(ঘ) উপধারা অনুযায়ী বেআইনি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় যথাযথ আয়কর এবং ১০ শতাংশ হারে জরিমানা দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে না, যা নৈতিকতা ও সংবিধান পরিপন্থি; যা সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। কালোটাকা সাদাটাকা উভয়ই মানি সার্কুলেশনের অন্তর্ভুক্ত হলেও অর্থনীতিতে প্রথমটির প্রভাব নেতিবাচক; যা সরকারের হিসাবের মধ্যে থাকে না, বিশৃঙ্খল গতিতে চলতে থাকে, আর্থসামাজিক পথে ক্ষত সৃষ্টি করে; যা প্রকারান্তরে ব্যাস্ট্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে অবক্ষয়ের রাস্তাকে প্রশস্ত করে। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য কুমার সেন বলেছেন, সভ্যতার গোড়া থেকে সাদা ও কালো পরস্পর হাত ধরাধরি করে আসছে; যা পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে। যেমন—পশ্চিমা বিশ্ব, মধ্যম আয়ের দেশ লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু দেশে যেখানে অফশোর হিসাব বলে একটি কার্যক্রম প্রচলতি আছে। যেখানে বিষেশায়িত অঞ্চলে কালোটাকা বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হয় না; যা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের একটি বৃহত্ অংশ দখল করে রয়েছে।

এই বাজেটের মাধ্যমে কালচার অব ক্রনি-ক্যাপিটালিজম বা অসদুপায়ে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে বিশাল সম্পদ গড়ে তোলার প্রবণতা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আর কালোটাকা সাদা করার প্রক্রিয়ায় সাড়া খুব একটা পাওয়া যায় না তিনটি কারণে :এক. জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) হয়তো নির্ধারিত ২০ শতাংশ (১০ শতাংশ কর ও ১০ শতাংশ জরিমানা) নিয়ে আয়কর রিটার্নের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা করল, কিন্তু ভয়টা হলো, ভবিষ্যতে এই রেকর্ড ধরে কালোটাকার মালিক হয়রানির শিকার হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি নিয়ে ভরিষ্যতে কোনো প্রকার ঝামেলা করতে পারে। কারণ দেশের প্রচলিত আইনে এর কোনো সুরক্ষার কথা বলা নেই। তৃতীয়ত, সামাজিক মর্যাদার ভয় রয়েই গেছে। কারণ বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে কালোটাকার মালিক যদি আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে কোনো মামলায় জড়ান, তবে তা বংশপরম্পরায় যাতনা বইতে হবে; যা মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায় যে, ২০০৯ সালে অর্থনীতিতে ৬২.২ শতাংশ কালোটাকা ছিল, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা; যা সেই সময়ের ঘোষিত বাজেটের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা; যার জন্য সুযোগটা রাখা হয়েছে ষোষিত-অঘোষিতভাবে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, দেশে অপ্রদর্শিত কালোটাকার পরিমাণ ৭ লাখ হাজার কোটি টাকার ওপরে; যার কোনো প্রভাব দৃশ্যত অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে না। এই কালোটাকার উপস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা দৃশ্যমান তা হলো (১) ধনী-গরিবের আয়ের বৈষম্য সৃষ্টি; (২) দ্বৈত অর্থনীতি (কালো বনাম সাদা); (৩) জাতীয় আয়ে তথ্যবিভ্রাট; (৪) সরকার কর্তৃক রাজস্ব হারানো; (৫) সামাজিক ন্যায়বিচার পতিষ্ঠায় ভাটা; (৬) বাহুল্য ব্যয় বৃদ্ধি; (৭) দুষ্প্রাপ্য সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ, যা বাজারব্যবস্থায় মূল্য বাড়ায়; (৮) সমাজের নৈতিক মানদণ্ড নষ্ট হয়; (৯) উত্পাদনব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইত্যাদি।

এসব সমস্যার সমাধানকল্পে একটি স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যা বাজেট বক্তৃতায় তেমন উল্লেখিত হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদি কালোটাকার অনুশীলন কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়; যা এখন থেকেই সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন—প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মোরিলের বক্তব্যের আলোকে কালোটাকার পরিমাণ নির্ধারণসহ বাহকদের চিহ্নিত করতে হবে; যাতে অর্থনীতির অনুকূলে ইতিবাচক কার্যক্রম নেওয়ার পথ সুগম হয়। দ্বিতীয়ত, প্রখ্যাত আরো এক জন সমাজ বিশ্লেষক কার্ল মার্কসের উক্তি হলো, কালোটাকা ছাড়া কোনো পুঁজি গঠিত হয় না এবং তা যদি সত্য হয়, তাহলে দেশের ভেতরে যে কালোটাকা রয়েছে, তা দিয়ে গঠিত পুঁজি দেশের বড় বড় খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যার ফলে বিদেশনির্ভরতা কমবে। তৃতীয়ত, দেশের ভেতরে কালোটাকা উত্পাদনের ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করতে হবে ক্রমান্বয়ে।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক পরিচালক, বার্ড (কুমিল্লা), সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ), সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

ইত্তেফাক/এমএএম