চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং বলেছিলেন, কোনো কোনো মৃত্যু আছে ফিনিক্স পাখির পালকের মতো হালকা, আবার কোনো কোনো মৃত্যু আছে থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারি’- গত চার বছর ধরে এমনই এক পাহাড়সম মৃত্যুর ভার বহন করছে কাজিপুরের মানুষ। তিনি চলে গেছেন দূরে, সুদূরের সীমানায়—তাকে হারানোর বেদনা বুক থেকে সরানো যেন এক পাথর সরানো মতই! মোহাম্মদ নাসিমকে হারিয়ে আমরা পাথর সরানোর চেষ্টা করছি বটে তবে সেটা কখনোই সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ নাসিম ভাই বেঁচে থাকলে এখন ছিয়াত্তর বছর পূর্ণ হতো। সংসদ সদস্য হিসেব পার করতেন ৩০ বছরের অধিককাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে মোহাম্মদ নাসিমের উপস্থিতি এখনো ভাস্বর হয়ে রয়েছে। বৃক্ষ বিশালতায় পত্রপল্লবের মতো স্মৃতিপটে এখনও চির সবুজ তিনি। কাজিপুরের মানুষ সময়ে-দুঃসময়ে, ক্রান্তিতে, ক্লান্তিতে, বোধে, বেদনায়—এখনো যাকে গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি মোহাম্মদ নাসিম।
বাংলাদেশ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী রাজনীতির অঙ্গনের কীর্তিমান পুরুষ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, সংগ্রামী জননেতা মোহাম্মদ নাসিম যেখানেই যে অবস্থায় থাকুক, তিনি মন্ত্রী থাকুক বা দলের নেতা থাকুক, তিনি দলের কর্মীদের অন্তপ্রাণ ছিলেন। মাছ যেমন জল ছাড়া থাকতে পারেনা, তেমনি মোহাম্মদ নাসিম কর্মী পরিবেষ্টিত না থাকলে হাঁপিয়ে উঠতেন, মনে হতো যেন তাঁর শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। কর্মীদের জন্য তিনি ছিলেনে এতটাই উতালা। যখন যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই মন্ত্রণালয়ের দরজা কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতেন এবং নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তাঁর কাছে যেতেন এবং তিনি ছিলেন কর্মীদের এক ভরসার স্থান। রাত আর দিন নয় নেতা-কর্মীদের বিপদে ফোন ধরেছেন সব সময়। যদি কোনো কারণে ফোন ধরতে না পারতেন, পরবর্তীতে কলব্যাক করেছেন। নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনবান্ধব ও কর্মীবান্ধব নেতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি একজন অসাধারণ প্রমিথিউস। কি ছিল তার রাজনীতির পুঁজি? মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এলাকার উন্নয়ন, দেশপ্রেমই ছিল তার রাজনৈতিক পুঁজি, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার প্রদত্ত প্রতিটি বক্তৃতাই যেন একেকটি অনবদ্য দলিল হয়ে রয়েছে সংসদ আর্কাইভে, কোটি মানুষের হৃদয়ে।
জাতীয় চার নেতার অন্যতম ছিলেন শহীদ এম মনসুর আলী। আজীবন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য লড়াই করেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আস্থা রেখে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মোহাম্মদ নাসিমও বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই-সংগ্রামে মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন প্রথম কাতারের অকুতোভয় সৈনিক। গণমানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে তার অবদান, আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ত্যাগ আজ নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। দলের যেকোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে যে গুটি কয়েক রাজনীতিবিদ এখনো লালন করতেন তাদের মধ্যে মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন অন্যতম। মূলত মোহাম্মদ নাসিমের আগ্রহ এবং উৎসাহের কারণে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জোট, প্রগতিশীল রাজনৈতিক জোট ১৪ দল টিকে ছিল। মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলের নেতাদের হতাশ হতে দিতেন না। তাদের নিয়ে নানারকম কর্মসূচী এবং কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতেন, ১৪ দলকে সচল এবং সরব রাখার ক্ষেত্রে যেন একাই লড়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে ২০১৯ এর নির্বাচনের পর যখন আওয়ামী লীগ একলা চলো নীতি গ্রহণ করলো, ১৪ দলকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হলো, তখনো মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলকে সক্রিয় করার জন্যে কাজ করে গেছেন। করোনা সংক্রমণের পরেও তিনি ১৪ দলের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে বৈঠক করেছেন, করোনা মোকাবেলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ১৪ দলকে লালন করেছেন নিজ সন্তানের মতো।
আর মোহাম্মদ নাসিম জানতেন যে, বাংলাদেশে প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনাকে লালন করতে গেলে আওয়ামী লীগ একা নয়, প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে লাগবে। ১৪ দলের ঐক্যের ব্যাপারে তাই তিনি ছিলেন সবসময় সংবেদনশীল। এই সমস্ত কারণে মোহাম্মদ নাসিম অনন্য ছিলেন। অসাধারণ একজন জননেতা হিসেবে তার কর্মমুখরতায় মানুষকে তিনি সম্মোহিত করে রেখেছিলেন তার গোটা রাজনৈতিক জীবনে। নাসিম ভাই ছিলেন আমাদের গর্বের উপলব্ধি। তার কর্ম জীবনের কর্মপরিধির বিশালতা তার রাজনৈতিক জীবনকে বর্ণময় করে রেখেছে।
মোহাম্মদ নাসিম ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলনে। তিনি ১৯৬৫ সালে পাবনা জুবিলী হাইস্কুল থেকে এসএসসি (মেট্রিক) পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে এডওয়ার্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় ভুট্টা আন্দোলনে পিতা এম মনসুর আলীর সঙ্গে কারারুদ্ধ হন। তিনি কারাগার থেকেই আইএ পরীক্ষা দেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
সেই সময় ছাত্র রাজনীতি করার অপরাধে মোহাম্মদ নাসিমকে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে টিসি দেওয়া হয়। তখন তাকে লেখাপড়ার জন্য পাবনা ত্যাগ করতে হয়েছিল। তিনি ঢাকায় এসে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। এরপর ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি কলকাতা অবস্থানকালে সীমান্তবর্তী যুবক্যাম্প এবং শরণার্থী শিবির পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। ১৯৯২ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ ছিল মাত্র একটি। তারপর থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন ১৪ দলের মুখপাত্র হিসেবেও। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা এলে প্রথমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, পরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সর্বশেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ নাসিম।
আওয়ামী রাজনীতিতে তার অবদান কতটা তার প্রমাণ মেলে তার মৃত্যুর পর দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোকবার্তায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পিতার মতোই মোহাম্মদ নাসিম আমৃত্যু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে গেছেন। সকল ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যন্য অবদান রেখেছেন। শেখ হাসিনা আরো বলেছিলেন, মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন দেশপ্রেমিক ও জনমানুষের নেতাকে হারাল। আমি হারালাম বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার আগ পর্যন্ত দলীয় সভাপতির নেতৃত্বের প্রতি তিনি কতটা আস্থাশীল ছিলেনে শেখ হাসিনার শোকবার্তায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।’
প্রবীণ রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদ নাসিম মানুষের আবেগ বুঝে রাজনীতি করেছেন। যে কারণে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের মানুষ তাকে সব সময় ভালোবেসে বিজয়ী করেছেন। আওয়ামী লীগের কঠিন সময়েও তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তাকে হারানোর ব্যথা মানুষ সহজে ভুলতে পারবে না’।’
জ্ঞানতাপস, মুক্তিযোদ্ধা এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতির ঋষিপুরুষ নাসিমকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে কখনোই মুছে ফেলা যাবে না। সর্বক্ষেত্রে তিনি এখনো আমাদের অনুকরণীয়, আগামীতেও থাকবেন।

